শিল্পী শাহাবুদ্দিনের আঁচরে আমার শস্তা শার্টটি আজ পৃথিবীর একটি অমূল্য শিল্পকর্ম

0
1662

এমন সোনাঝরা রোঁদেলা বিকেল আমার জীবনে আসেনি কখনও! গতকাল ২৮ সেপ্টম্বর ২০১৮, শুক্রবার দিনটি হয়তো জীবনের শ্রেষ্ঠতম, স্মরণীয়, আনন্দময় দিন।

গতকাল ছিল শেখ হাসিনার ৭১তম জন্মবার্ষিকী (৭২তম জন্মদিন) এবং প্রিয় নেত্রি মারুফা আক্তার পপি’র সংগঠন “হাসুমনির পাঠশালা”-র ১ম বর্ষপূর্তি। এ উপলক্ষ্যে সকাল ১০টা থেকে শিশু একাডেমীতে ৭১টি ক্যানভাসে ৭১ জন শিল্পী নেত্রীর ৭১টি পোট্রেট আঁকছেন। বাংলাদেশের অধিকাংশ দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পীদের সাথে অংশ নিয়েছেন অনেক প্রতিশ্রুতিশীল নবীন শিল্পী। মূল আকর্ষণ ছিল বিশ্ববরেণ্য শিল্পী শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে ৭১ ফুট লম্বা একটি ক্যানভাসে শিশুদের আঁকাআঁকি।

প্রচন্ড যানজটের কারণে শাহবুদ্দিন আসলেন পৌঁনে দুইটায়। সামান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে ক্যানভাসে তুলির আঁচর কাঁটলেন শিল্পী। মাত্র ৮ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে পৃথিবী পেল আরও একটি মহান সৃষ্টি। সন্তান কোলে নিয়ে ছুটেচলা এক মায়ের চিরায়ত সংগ্রাম ফুঁটে উঠলো শাহাবুদ্দিনের ক্যানভাসে। বুঝলাম ৭১ বয়সী এক রাষ্ট্রনায়কের প্রতি এক ক্ষণজন্মা পুরুষের গভীর নৈবেদ্য। এরপরই সাংবাদিকরা ঘিরে ধরলো শাহবুদ্দিনকে। অগনিত ক্যামেরার ফ্লাশ জ্বলে উঠছে একটার পর একটা।

এই জটলার পাশেই কৃতি শিল্পী কিরিটী বিশ্বাস আঁকা প্রায় শেষ করেছেন নেত্রির একটি পোট্রেট। দাদারে জিগ্যেস করলাম “শাহাবুদ্দিন ক্যামনে কয়েটা আঁচরেই ক্যানভাসে ফুঁটিয়ে তুলেন একেকটা মহাকাব্য?” কিরিটী দা তখন বললেন “এক মাইকেল এঞ্জেলো এরপরই শাহাবুদ্দিন এই দু’জনই শুধু আমার গুরু।”

আমার সাথে সুমনা ও মন। আমার গায়ে সাদা একটি হাফ শার্ট। গত সপ্তাহে আমার এক বন্ধু বায়তুল মোকাররমের ফুটপাত থেকে সাদা ও নীল রঙের দুইটি হাওয়াই হাফশার্ট কিনেছিল। শার্টগুলোর প্রশংসা করায় সাদাটি আমাকে দিয়ে দিল। সকাল বেলা বাসা থেকে বের হওয়ার সময় স্ত্রী একটি কমলা কালারের শার্ট ইস্ত্রি করে হাতে দিল। শার্টটি গায়ে দেয়ার সময় সাদা ঐ শাটর্টি চোখে পড়ল। মুহূর্তেই একটি বুদ্ধি এলো; স্ত্রীকে বললাম “সাদাটা আমিই ইস্ত্রি করি, এই শার্টটার পিছনে কাউকে দিয়ে কিছু আঁকাইয়া আনবো আজ। তোমার সাজুগুজু শেষ হইলে বাচ্চাগো লইয়া তোমার মত চইলা আইসো, আমি ফুটলাম।”

যাইহোক আড্ডা দিচ্ছি কিরিটীদার সাথে। দাদারে বললাম, “আপনিও একদিন শাহাবুদ্দিন হইয়া যাবার পারেন। লন হাতের তুলিটা দিয়া জামার পিছে দুইটা টান দিয়া দ্যান”। দাদা মজা পাইলেন। আমার পিঠে দুইটা টান দিয়া জামায় সাক্ষর করে দিলেন। আরও একজন শিল্পী এগিয়ে আসলেন জামাটাকে বিখ্যাত করার জন্য, ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ আমি সাহসী হয়ে উঠলাম। দাদারে বললাম “আপনার গুরুরে কন না আমার পিঠে দুইটা টান দিয়া দিতে!” দাদা বললেন, “তোর মাত্থা খারাপ, এত্ত সাহস আমার নাই।” শত শত শিল্পী-সাংবাদিক ঘেরা শাহাবুদ্দিন, কথা বলছেন মিডিয়ার সাথে। তার পাশে পপি আপা, শিখুদি, জুনাইদ ভাই…। কিরিটী দা’র হাত থেকে তুলিটা হাতে নিয়ে খুবই আত্মবিশ্বাসের সাথে বহুকালের পরিচিত আপনজনের মত অধিকার নিয়ে পিছন থেকে বললাল, “পপি আপা- শিখুদি সর, সরোতো! শাহবুদ্দিন ভাই এই নেন দুইটা টান মাইরা দ্যান আমার পিঠে” বইলা ব্যাপক ভাব নিয়া তুলিটা ধরিয়ে দেলাম শিল্পীর হাতে। অগণিত ফ্লাশ জ্বলে উঠলো চারিদিক থেকে, সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ়। শাহাবুদ্দিনও মজা পেলেন। তার ভাঙ্গা দাঁতের ফাঁক দিয়ে বেড়িয়ে এল শিশুর মত সরল এক অট্টহাসি। তার মোটিভ বুঝতে পেরে চারু শিক্ষক বন্ধু খোকন এগিয়ে ধরলো রঙের থালা। আমি কুঁজো হয়ে আছি, শাহাবুদ্দিন হাসছেন আর আঁকছেন আমার পিঠে, ফুটপাত থেকে কেনা একটি সস্তা শার্ট হয়ে উঠছে পৃথিবীর একটি অমূল্য সম্পদ। ক্যামন যেন একটি অবিশ্বাস্য ঘোরের মধ্যে কেটে গেল দুই থেকে তিন মিনিট। এও কি সম্ভব! এও সত্য! শাহাবুদ্দিন আঁকা শেষে সাক্ষর করতে করতে বললেন “ভালোভাবে শুকিয়ে নিও। জয়বাংলা, খুশিতো!”

সিনিয়র শিল্পীরা বললেন- শার্টটা খুলে ফ্যানের নীচে শুকাও; কিভাবে এটি সংরক্ষণ করতে হবে, কিভাবে বাঁধাই করতে হবে….। একটি চেয়ারে শার্টটা ঝুলিয়ে অবাক নয়নে তাকিয়ে দেখলাম শাহাবুদ্দিনের তুলির আঁচড়ের কয়েকটি টানে আমার শার্টে ফুঁটে উঠেছে চিরায়ত সংগ্রামী এক যোদ্ধার নিরন্তর সংগ্রাম এবং এই অমূল্য শিল্পকর্মটির মালিক আমি!

দেশবরেণ্য কত শিল্পী, চারুকলার অগণিত ছাত্র-শিক্ষক, শত শত শিশু আর তাদের অভিভাবকগণ সবাই অবাক, আমি যেন সকলকে বোকা বানিয়ে মহামূল্যবান শিরোপাটি ছিনিয়ে নিলাম, সামান্যর জন্য তাদের হাতছাড়া হয়ে গেল একটি অমূল্য ধন, একটু সচেতন হলে তিনিও পারতেন! কি মিসটাই না হইলো!
কেউ কেউ বলছে ‘ছেলেটার কত্ত বুদ্ধি!’ শিখুদি বললো ‘সুমইনন্যা এই বুদ্ধিটা মাথায় আইলে তো আমি শাড়ির আঁচলটা মেইলা ধরতাম!’ কত কত যে আক্ষেপ একেক জনের তবুও সবাই খুশি আমার এই অমূল্য অর্জনে।