শিমুলবাগের শিমুল আপা, এ্যান আনব্লুমন্ড ফ্লাওয়ার

0
1252

তিনদিক নদীবেষ্টিত ফুলের মত ছোট্ট একটি অনুপম নির্মল শহর পটুয়াখালীর ধুলোমাটিজলে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আমাদের। একটি নস্টালজিক সাংস্কৃতিক আবহে কেটেছে আমাদের দুরন্ত শৈশব; এখানে প্রতিটি পরিবার একে অন্যের চিরচেনা, সুখ-দুঃখের সাথী। সেই ছেলেবেলায় বিভিন্ন প্রকারের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় যে পরিবারটিকে আমরা ঈর্ষা করতাম সেটি হল স্থানীয় নাইয়া পাড়ার নিভৃতচারী গুণি এক মফস্বল সাংবাদিক বাদল রশীদের পরিবার। শহরে নানা সংগঠনের আয়োজনে যত সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হতো তার অধিকাংশ পুরস্কারই যেত ঐ পরিবারে কেননা বাদল রশীদের পিঠাপিঠি ৩ কন্যা শিমুল, শিল্পী ও স্বপ্না- সবাই দারুণ মেধাবী, স্মার্ট, ফ্যাশনাবল, আধুনিকমনস্ক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় প্রায় সব ইভেন্টেই সমভাবে পারদর্শি। তদুপরি বাদল রশীদ নিজেও দক্ষ সাংস্কৃতিক সংগঠক, প্রশিক্ষক ও বিচারক। ওদের ৩ বোনের মধ্যে শিল্পী আমাদের বন্ধু, ও এখন শহরে একটি প্রতিবন্ধী স্কুলের প্রধান শিক্ষক। সবার ছোট স্বপ্না-সাংবাদিক এবং শিমূল আপা নারী অধিকারকর্মি। সব বোনের মধ্যে মুশফিকা লাইজু-শিমুল আপা সবচেয়ে বেশি বন্ধুবৎসল, জনপ্রিয় এবং গ্লামারে শহরের শীর্ষস্থানীয়া। কতটা জনপ্রিয় ও আশাজাগানিয়া নারী ছিল এই শিমুল আপা সেটার প্রমান- ‘নাইয়া পাড়া’র নামই কালক্রমে পরিবর্তিত হয়ে শিমুল আপার জন্য হয়ে গেল ‘শিমুলবাগ’। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি মহল্লার স্থায়ী নামকরণ হয়ে গেল একটি কিশোরীর নামে।
সামাজিক ও পারিবারিকভাবে ঋদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠা তুমুল কিশোরী শিমূল আপা যখন স্কুল কলেজের গন্ডি পেরিয়ে আশৈশবের অনুরাগ অনুযায়ী জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্বের প্রথম ব্যাচে ভর্তি হলেন খুব স্বাভাবিকভাবেই শহরের সবাই তাকে নিয়ে আকাশচুম্বি স্বপ্ন দেখলো। আমরা সবাই ভাবলাম পশ্চাদপদ প্রান্তিক জনপদ প্রিয় পটুয়াখালী থেকে প্রথমবারের মত দেশবরেণ্য একজন মেধাবী সেলিব্রেটি তৈরি হচ্ছে এবং নিশ্চিত ছিলাম ভবিষ্যতে আমরাও তাকে নিয়ে একদিন গর্ব করবো; আশৈশব তাকে চিনি বলে নিজেরাও হয়তো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবো। সাথে সাথে আমরা আশান্বিত ছিলাম যে পটুয়াখালীর আগামি প্রজন্মের অনেক মেধাবী তারুণ্য যথার্থ ভাবে বিকশিত হয়ে দেশময় আলো ছড়াবে শিমুল আপারই হাত ধরে। কিন্তু হায় ক্ষণজন্মা এক নাট্যাচার্যের বিকৃত লালসায় সকলের স্বপ্নচূর্ণ হয়ে গেল; তার ফিউডাল আগ্রাসী আচরণে ১ম বর্ষেই তাকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে হয়েছিল। স্যাড (Salim Al Din) নামের পিতৃতুল্য শিক্ষকরূপী এক স্যাডিস্ট হায়েনার জন্য প্রস্ফুটিতই হতে পারল না আমাদের প্রিয় শিমুলবাগের শিমুল আপা।
বাংলা সাহিত্যে নাট্যকর হিসেবে রঠা’র পরই স্যাডের অবস্থান।বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যের যতগুলো শাখা-প্রশাখা স্বাধীনতা পরবর্তি সময় উল্লেখযোগ্যভাবে স্বতন্ত্র ধারায় বিকশিত হয়েছে তার মধ্যে বাংলা নাটক ও নাট্য অন্যতম এবং এই উৎকর্ষতা এসেছে সেলিম আল দীন হাত ধরেই। খুব স্বাভাবিকভাবেই তার ব্যক্তিচরিত্রে এমনতর নৈতিক স্খলন মানতে আমাদের কষ্ট হয়। যত কষ্টই হোক না কেন বাস্তবতা হচ্ছে সত্যটা মানতে হবে। যারা মানতে পারেননি উপরোন্তু শিমুলের কাহিনীর অসরতা প্রমানে নানা প্রকারের হাইপোথিসিস দিচ্ছে তাদের মানসিক দৈন্যতা দেখে দুঃখ হয়। শুধু শিমুলের ক্ষেত্রেই নয় মিটু ঝড়ের সবগুলো কেসের ক্ষেত্রেই অনেকগুলো অবান্তর কমন প্রশ্ন অযোচিতভাবে উত্থাপিত হয়েছে এবং প্রতিটা প্রশ্নেরই যুতসই জবাব শোস্যাল মিডিয়ায় বেশ ভালোভাবেই এসেছে। তাই সেই ব্যাখ্যায় আর যাচ্ছি না।
যে বিষয়গুলোতে এখনও তেমন আলোকপাত করা হয়নি তেমন ভাবনা থেকেই শিমুল আপা বিষয়ক একটা ছোট্র ইন্ট্রো দিলাম কেননা না পূর্বপর না জেনে অনেকই অযৌক্তিকভাবে ভিক্টিমকে আরও আঘাত করেছে, এবং সেটা অনেক নোংরাভাবে। অপ্রত্যাশিতভাবে সেই আঘাতগুলো এসেছে আমাদের আশপাশ থেকেই। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্বকৃত অমানুষ (স্বীকৃত নোমান), সিনার বা পাপিষ্ট নামধারী এক সহপাঠি এবং সর্বশেষ সংযোজন সঙ্গিত ও মঞ্চনাটকের আরেক দিকপাল শ্রদ্ধেয় শিল্পী শিমুল ইউসুফ।
ব্যক্তিগতভাবে আমার দুর্ভগ্য-মিটুতে উঠে আসা নিপীড়ক ও নিপীড়িতের মধ্যে অনেকেই আমার ঘনিষ্ঠ বা পূর্বপরিচিত। কিন্তু সবইস্যু ছাপিয়ে শিমুল আপার পাশে দাড়ানোর অন্যতম একটি ব্যক্তিগত কারণ হচ্ছে শিমুল আপা আমাদের শৈশবের নায়িকা এবং সবগুলো কেসের মধ্যে শিমুল আপার এই দুর্ঘটনাটি নিঃসন্দিহানভাবে প্রমানিত। আমি এতটা নিশ্চিত হয়ে কথা বলছি এই কারণে যে শিমুল আপাই সবচেয়ে বেশি রেফারেন্স দিয়েছে এবং যে ৫/৬ জন বন্ধু বা সহপাঠির কথা বলেছে তারা প্রায় সবাই (মুন্না, আলম, কবির, কামাল..) আমার স্কুলের (পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়) সিনিয়র এবং অনেকের সাথেই আমি গত ক’দিনে এবিষয়ে অনেকবার কথা বলেছি। আমার এক প্রিয় অনুজ, তরুণ শিক্ষক তাই শ্লেষপূর্ণ একটি মন্তব্য করেছে, “ভাই আপনারা পটুয়াখালীবাসি সবাইতো দেখি একজোট হয়ে মহামাণ্যের মান ইজ্জত নিয়া টানাটানি শুরু করলেন।”
নিপীড়ণকারীরা আইনীভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত হওয়া সত্বেও এখন পর্যন্ত যে ডজনখানেক মিটু ইস্যু সামাজিক মাধ্যমে এসেছে তারমধ্যে একজন নিপীড়ণকারীও অদ্যোবধি কোন মানহানি মামলা বা কোন আইনী সুবিধা গ্রহণ করেনি বিধায় সকগুলো অভিযোগই সত্য বলে ধরে নেয়া যেতে পারে।
নির্বাচনের গরমে, মিটু এখন চরমে
পশ্চিমের মিটু’র ঝড়ো হাওয়া ভারত কাপিয়ে এখন বাংলাদেশে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে, জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সাথে যুগপৎভাবে এগিয়ে চলছে মিটু।নিপীড়ণকারীদের একটি বড় আত্মপ্রসাদ হলো নির্বাচনী ডামাডোলে তাদের অপকর্ম ঢাকা পড়ে যাবে। কিন্তু আমার কাছে এই সময়টাই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবং এটাই মোক্ষম সময়- জাতি চরিত্রে শুদ্ধাচার নিশ্চিতের। কেননা জাতি গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হচ্ছে রাজনীতিবিদদের।সকল রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আশা করছি- যেন সব দলের নির্বাচনী ইশতিহারে নারীর ক্ষমতায়ন প্রশ্নে মিটু আন্দোলনের মৌলিক চেতনা যেন যথার্থভাবে প্রতিফলিত হয়। আশার বিষয় হচ্ছে এখন পর্যন্ত কোন রাজনীতিবিদের নামে মিটু মুভ হয়নি। কিন্তু কোনদিন যে হবে না তার কি কোন গ্যারান্টি আছে?
বাংলাদেশের নির্বাচনে একটি প্রচলিত শ্লোগান হচ্ছে…‘অমুক ভাইয়ের চরিত্র, ফুলের মত পবিত্র!’ মাথায় রাখতে হবে যে কোন পেশার চেয়ে রাজনীতিবিদদের জন্য চারিত্রিক সনদটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অফ দা রেকর্ড কিন্তু অনেকেই জানে অনেক নেতারই ফুলের মত এই চরিত্রটা কতটা পবিত্র! তদুপরি অনেক রাজনৈতিক নেতার নামে শুধু অনৈতিক সম্পর্ক বা মলেস্টিংয়ের অভিযোগই নয়, শিশুকামিতার মত গুরুতর অভিযোগও আছে। এই ভয়াবহ অপকর্মটি অনেককাল ধরে শুধু মাদ্রাসাকেন্দ্রিক বলে স্যেকুলারিজমের হাসি দিয়া লাভ নাই কেননা ক্যাডেট কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত, ঘরে বাইরে সর্বত্রই নীরবে নিভৃতে এইসব পশুদের পৈচাশিক ফুর্তির শিকার হয়ে ভয়ানক ট্রমা নিয়ে বেড়ে ওঠছে একেকটি নতুন প্রজন্মের অনেক ছেলে শিশু।আমি বিশ্বাস করি নিকট ভবিষ্যতে শিশুকামিতাও উঠে আসবে মিটু আন্দোলনে।
মিটু আন্দোলনের প্রধান লক্ষ অপরাধীদের আইনী শাস্তি নয়, সামাজিকভাবে নিপীড়কদের মুখোশ উম্মোচনপূর্বক সা্মাজিক সচেতনতা তৈরি। সেই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ অনেক পরে মিটু আন্দোলনে যোগ দিলেও সাফল্য আসছে অসাধারণ গতিতে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশেষকরে মিডিয়া হাউস, সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং কর্পোরেট সেক্টরে এটা ঝড় তুলেছে বেশি। তবে এত সম্ভবনার পাশাপাশি মিটু আন্দোলনের সীমাবদ্ধতাও কম নয়। একেতো অপরাধ প্রমানে আইনী সীমাবদ্ধতা যেমন আছে তেমনি এই ঝড় শুধু সমাজের উপর তলাটাই তোলপার করছে এবং বিশ্বব্যাপি মিটু আন্দোলন সেলিব্রেটিদেরই মুখোশ উম্মোচিত হচ্ছে বেশি। বাংলাদেশে প্রান্তিক কর্মরজীবি নারীরা অশিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত বা পশ্চাদপদ বিধায় মিটুর ঠেউ প্রান্তিকে কোন প্রভাব রাখে না। কিন্তু আশা ও সম্ভাবনার বিষয় হচ্ছে উবার-পাঠাও যুগে লক্ষ লক্ষ অর্ধশিক্ষিত বাঙালি যুবকরা যেভাবে প্রযুক্তিপ্রিয় হয়ে ওঠছে এরই ধারাবাহিকতায় গৃহকর্মিদের মিটু আন্দোলনে শরিক হওয়া এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। যে হারে গৃহকর্মিসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠি মোবাইল ব্যবহার করছে সেটা দেখেই এটা অনুভব করা সম্ভব। তখন ক’জন বাঙালি বাবুগিরিটা ধরে রাখতে পারবে তা শুধু বিধাতাই জানে।
কাজীর গরু শুধু কেতাবেই আছে
বিশ্বব্যাপি নারীর অধিকার নিয়ে লক্ষাধিক এনজিও বা প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ইউএন অর্গানাইজেশনসমূহসহ কোন প্রতিষ্ঠান বা কর্পোরেট সেক্টরে নারী নিপীড়ণ বিরোধী কোন প্লাটফর্ম বা কার্যকর কর্মসূচি চোখে পড়ে না। অথচ দাবি আদায়ে বাংলাদেশই সবচেয়ে এগিয়ে ছিল এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায়। ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা ও আইনের দাবি প্রথম উত্থাপিত হয়। এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন। তারপর অনেক নারী সংগঠনও সমদাবীতে সোচ্চার হয়। ২০০৮ সালের ৭ আগস্ট সালমা আলীর রিটের প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট একটি অসাধারণ রায় দেন। এ রায়ে বিভিন্নভাবে যৌন নিপীড়নকে সংজ্ঞায়িত করে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে নারী নিপীড়ন বিরোধী সেল গঠনের নির্দেশণা দেয়া হয়। কিন্তু কোন কর্মক্ষেত্র বা অফিস তা কার্যকর করেছে বলে শুনিনি। শুধু কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া। তাও আবার ছাত্রদের দাবির মুখে সেই সেল গঠিত হয়। কিন্তু পরবর্তিতে তার কোন কার্যকারিতা তেমন করে চোখে পড়ে না। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালের ২৬ জানুয়ারি যৌন হয়রানি বন্ধে সাত দফা নির্দেশনাসহ আরেকটি রায় প্রদান করেন হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি মো. ইমান আলী ও বিচারপতি শেখ হাসান আরিফের বেঞ্চ। কিন্তু অদ্যোবধি তার ১টি ধারাও বাস্তবায়িত হয়েছে বলে ধরা যায় না। উচ্চ আদালতের নির্দেশণা বা আইন থাকার পরেও তার কোন প্রয়োগ নেই। সবই কেতাবী কাজীর গরুর ন্যায় আমাদের কাগুজে অর্জন।
ব্লুমড এ্যান্ড আনব্লুমন্ড শিমুলস
বাংলাদেশে হাতেগোণা যে ক’জন গুণি শিল্পী আছে যারা ফুলের ন্যায় চিরকাল সুবাস ছড়ায় সাংস্কৃতিক অঙ্গণে শ্রদ্ধেয় শিমুল ইউসুফ তাদেরই একজন। আর মুশফিকা লাইজু শিমুল হচ্ছে এমনই কপাল পোড়া এক অভাগা নারী যে শত সম্ভবনা থাকার পরও প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই চুপসে গিয়েছিল ৩১ বছর আগে। একটি নিশ্চিত সম্ভবনাময় নারীর সকল আশা স্বপ্ন এমনতরভাবে ধুলিস্যাত হওয়াটা যে কতটা কতটা কষ্টের, কতটা যন্ত্রণার, কতটা অপমানের সেটা অনেকেই বুঝতে চাইনা। কতটা শক্তি সাহস থাকলে সকল প্রকার লোক লজ্জার সাথে চ্যালেঞ্জ দিয়ে পরদেশের মাটিতে নয় নিজ দেশে বসেই এই সংগ্রামটা চালিয়ে নেয়া যায় শিমুল আপা সেটাই আমাদের দেখিয়ে দিলেন। একাবিংশের নারী জাগরণে শিমুল আপার এই সংগ্রাম নিপীড়িত নারীর ঘুরে দাড়ানোর অপার শক্তি-সাহস-উৎসাহের উপমা হয়ে রইবে।
বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের শীর্ষস্থানীয় অভিনেত্রি, শিল্পী শিমুল ইউসুফ আমাদের অহংকার। বাংলাদেশের প্রধান সাংস্কৃতিক সংগঠক মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও শিমুল ইউসুফ দম্পতি তাদের গোটা জীবনটাই উৎসর্গ করেছে দেশ ও দেশের সাংস্কৃতিক জাগরণে। জীবনভর সেলিম আল দীনের সবচেয়ে নিকটতম সহযোদ্ধা এই পরিবার। তাই এই স্যাডময় অধ্যায় উম্মোচিত হওয়ার পর অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলাম শুধু বাচ্চুভাইর প্রতিক্রিয়া জানতে। অবশেষে জানা গেল শিমুল ইউসুফের প্রতিক্রিয়া। তার প্রতিক্রিয়ার শেষটা এরকম,
‘…সবশেষে বলছি সেলিম ভাই আমার শিল্পগুরু। শিল্পগুরুর অপমান এত সহজে হজম করব না। আমরা আছি, ঢাকা থিয়েটার আছে,গ্রাম থিয়েটার আছে, সেলিম আল দীনের অগুনিত ছাত্র ছাত্রী আছে সেলিম ভাইয়ের পাশে। থাকবে সারা জীবন।’
দেশবরেণ্য গুণিশিল্পী শিমুল ইউসুফের সাথে আমিও একমত শিল্পগুরু নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন চির নমস্য, বাঙালির সংস্কৃতির ভুবনে তার ঋণ অপরিশোধ্য, তার পাশে আমরাও আছি সারা জীবন, কিন্তু লম্পট, নিপীড়ক, অমানুষ স্যাডের পক্ষে থাকবো না কোন দিনও।

পরিশেষে আরেকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছি যেটা শুনে অনেক মুরিদরাই তেলে বেগুণে জ্বলে উঠতে পারে।ঘটনার পরদিন সহপাঠিদের কাছ থেকে যথেষ্ট সারা না পাওয়ায় শিমুল আপা নিজেই গিয়েছিলেন স্যাড়ের রুমে, শুধু ছোট্ট একটি সরি শোনার জন্য। দুই শিমুলই এখানে একমত সামান্য ছোট্ট্র একটি শব্দ ‘সরি’ বললেই সব ঠিক হয়ে যেত এবং শিমুল ইউসুফ দাবি করেছেন তাকে জানালে তিনি নিশ্চয়ই স্যাড কে স্যাড বানাতে সক্ষম হতেন। জানিনা কি হত। কিন্তু যেটা হয়েছিল সেটা শুনুন এবং সক্ষমতা থাকলে হজম করুনঃ
বাইরে কয়েকজন বন্ধু রেখে শিমুল আপা যখন যথেষ্ট সাহসী হয়ে একাই ঢুকলো স্যাডের রুমে, সরি বলাতো দূরের কথা মহা গর্জণে একের পর এক উপর্যুপরি থ্রেট দিয়ে তেড়ে গেল শিমুলের দিকে, নিথর-নিশ্চুপ শিমুল তখন বিকট শব্দে প্রথম একটা কঠিন থাপ্পর দিল টেবিলের গ্লাশের উপর; আরেক মহা চরিত্রবান অভিনেতা শিক্ষক আফসার আহমেদ পাশের রুম থেকে প্রকান্ড শব্দ শুনে স্যাডের রুম হতে শিমুলকে বের করে দেয়ার আগেই শিমুল সজোরে দ্বিতীয় থাপ্পরটি যুৎসইভাবে বসিয়ে দিল স্যাডের বাম গালে। প্রিয় পাঠক আবারও বলছি থাপ্পরটি ছিল লম্পট স্যাডের গালে, পরম পুজনীয় নাট্যাচার্য্য সেলিম আল দীনের গালে নয়।আমি নিশ্চিত একজন প্রথম ব‌র্ষের ছা‌ত্রী যখন এত বড় সাহস দে‌খি‌য়ে‌ছে তখন নির‌বে তার ক্যাম্পাস থে‌কে বিদায় হওয়া ছারা আর কোন দ্বিতীয় উপায় ছিল না । তবে স্যাড কে ধন্যবাদ জীব‌নে প্রথম ও শেষ বা‌রের মত একান্ত সঙ্গোপনে হজম ক‌রে‌ছে তার অনাকাং‌ক্ষিত এই অপমান ।
চিরদুখী শিমুল আপা, আপনার আর শিমুল ফুলের মত প্রস্ফুটিত হয়ে সমাজে মুগ্ধতা ছড়ানো হলো না সত্য তবু আমরা জানি অনিঃশেষিত বাকি শক্তিটার সকটুকুই আপনি উৎসর্গ করেছেন অধিকার বঞ্চিত নারীদের জন্য। শৈশবের নায়িকার কাছে যা প্রত্যাশা ছিল, শত বাঁধার পরও তারচেয়ে আমরা কম কিছু পেয়েছি বলে মনে হয় না। এখানেই আপনি অনন্য।
আপনার বাবার হাতে বানানো ওভার কোর্টটি রক্ষাকবচ হয়ে আপনার সম্ভ্রম যেমন বাঁচিয়েছে, তেমনি আপনার বাবার ছায়া আমরাও পেয়েছি সারা জীবন। জানিনা জীবিতকালে এ ঘটনা জানলে বাদল রশীদের তাৎক্ষনাত হার্টফেল হতো কিনা, কিন্তু এটা জানি মাথানত না করে শক্ত মেরুদন্ড নিয়ে আত্মজার এই ঘুরে দাঁড়ানোটা দেখলে তিনি আরও শান্তিপূর্ণভাবে গভীর ঘুমটা দিতে পারতেন। শেষ একটি বাক্য উচ্চারণ করে শেষ করি,
“আম্গো বাপ দাদারা বাঘ কুমিরের লগে লড়াই কইরা দক্ষিণে বসত গড়ছে মাথা উঁচা কইরা । অসুন্দরের প্রতি প্রচন্ড থাপ্পরটি আমাদের লিগ্যাসি। তাগো উত্তরপুরুষ হিসেবে তাই জাহাঙ্গীর নগরের সেই ভাস্কর্যটি নয় আপনিই আমাদের গর্বিত জীবন্ত সংশপ্তক।”