যাকে নিজ কন্যার পতি বানাতে আপত্তি ছিল সেই বিদায় নিলেন রাষ্ট্রের পতি হয়ে!

0
1115

কাহিনীটা শুধু সিনেমেটিক নয় তার চেয়েও বেশী কিছু। এরকম একটি রোমান্টিক ইতিহাস শুধু বাংলার রাজনীতিতেই নয় সিনেমা কিংবা সাহিত্যেও বড় দুর্লভ।

ভৈরবে দুটি প্রভাবশালী পরিবারের শত্রুতা চলছে বংশপরম্পরায় । একদিকে দৌড়চন্ডীবের গ্রামের সরকার বাড়ি। আরেকদিকে ভৈরবপুর গ্রামের মোল্লা বাড়ি। উভয় পরিবারই শিক্ষিত বর্ধিষ্ণু মুসলিম অভিজাত। শিক্ষা-দীক্ষা, প্রভাব-প্রতিপত্তি, বিত্ত-বৈভব, ইজ্জত-সম্মানে দুই বাড়িই সমানে সমান। কিন্তু কেউই কারো ছায়া মাড়ায় না।

সময়টা বোধকরি ১৮ শতকের শেষদিকে। মেঘনা-ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গমস্থলে জেগে ওঠা বিদীর্ন চরাঞ্চলটি ‘উলুখাগড়ার বন’ নামে পরিচিত ছিল। জায়গাটির নাম হয়ে যায় উলকান্দি এবং ভাগলপুর (বাজিতপুর) দেওয়ানদের জমিদারীর অংশ হয়ে যায়। ভাগলপুরের জমিদার দেওয়ান সৈয়দ আহমেদ রেজা আধ্যাতিকতার চর্চায় নিবিষ্ট থাকতো বলে তাকে পাগলা সাব বলে ডাকতো সবাই পায়। মেঘনার পূর্বপাড়ের নূরনগর পরগণার অন্যতম তালুকদার, নবীনগর উপজেলার বিটঘরের দেওয়ান ভৈরব রায় ভাগলপুরের দেওয়ানের মৌখিক অনুমতি নিয়ে (দলিল, পাট্টা ছাড়া) পাশ্ববর্তি কিছু সাহসী কৃষক আর জেলেদের নিয়ে সেখানে জনবসতি গড়ে তোলে। কৃষির পাশাপাশি অবস্থানগত কারণে কয়েক দশকের মধ্যেই এখানে গড়ে ওঠে বিশাল বাজার। পরবর্তিতে মুক্তাগাছার জমিদার ভবানী কিশোর আচার্য্য চৌধুরী বহু রক্তপতের বিনিময়ে দখলে নেয় এটি, কিন্তু লোকমুখে প্রতিষ্ঠা পায় ভৈরব বাজার হিসেবে। আজও ভৈরব তেজারতি, মনোহারি ও আরতদারী ব্যবসার বিশাল মোকাম।

এই ভৈরব বন্দরের এক শীর্ষ স্থানীয় ব্যবসায়ী দৌড়চন্ডীবের গ্রামের কামাল সরকার। একনামেই চিনতো তাকে ভাঁটি অঞ্চলসহ কিশোরগঞ্জ তথা বৃহত্তর মোমেনশাহীর মানুষ। পরবর্তিতে এই সরকার বাড়ির উত্তরাধিকার প্রফেসর জালালুদ্দিন আহমেদ। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা কলেজের পৌনে দুইশত বছরের ইতিহাসে একজন জাদরেল অধ্যক্ষ হিসেবে প্রফেসর জালালের খ্যাতি ছিল দেশজোড়া। ৮টি সুন্দরী কন্যা ও ৪টি মেধাবী ছেলের জনক এই জালাল প্রফেসর। তার এই রূপবতি ও গুণবতী কন্যাদের পাণিপ্রার্থী হিসেবে দেশের শীর্ষস্থানীয় এলিজেবল ব্যাচেলররা লাইন ধরেছিল । কিন্তু জালাল মাষ্টার সিএসপি অফিসার ছাড়া কাউকেই পাত্র হিসেবে এলিজেবল ভাবতেন না। গুলশান যখন ভোলা নামক গ্রাম ছিল সেই গ্রামের অভিজাত পরিবার মাষ্টার বাড়ীর ডেপুটি মেজিষ্ট্রেট এম এ সিদ্দিকীর (শেখ রেহানার শ্বশুড়) সাথে জালাল মাষ্টার তার ১ম মেয়ে শামসুন্নাহারকে বিয়ে দিয়ে তার কন্যাদের পতিদের স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করে দিলেন।

কামাল সরকারের জমানায় পার্শ্ববর্তি ভৈরবপুর গ্রামের বালকি মোল্লা নামে এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর আধিপত্য ছিল ভৈরব বন্দরে। বালকি মোল্লা সেই সময়ে পায়ে হেঁটে হজ্জ্ব করেছিলেন। দেড় শতাব্দির বেশী সময় ধরে এই দুটি প্রভাবশালী পরিবারকে এই দুই মানুষের নামেই চিনে আজও ভৈরবের মানুষ। বালকি মোল্লার বাড়ি অনেকে আবার মুন্সি বাড়ি বলেও চিনে। উনবিংশ শতাব্দির শেষ দিকে বালকী মোল্লার ছেলে এ্যাডভোকেট হাজী মোজাফ্ফর মুন্সী মোমেনশাহী কোর্টে একজন নামকরা আইনজীবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তার একমাত্র ছেলে এ্যাডভোকেট মেহের আলী ময়মনসিংহ ডিস্ট্রিক্টবোর্ডের সদস্য ও লোকাল বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। মজার বিষয় মোল্লা বাড়িতে কয়েক পুরুষ ধরে প্রত্যেকের একটি মাত্র ছেলে সন্তান হয়। এ্যাডভোকেট মেহের আলীর একমাত্র ছেলে জিল্লুর রহমান ১৯২৯ সালের ৯ই মার্চ নানা বাড়ি ব্রাম্মণবাড়িয়ার পইরতরার খাঁ বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের মাত্র ৭ মাসের মাথায় মাকে হারান আর ৯ বছর বয়সে পিতৃহীন হন জিল্লুর রহমান। তারপর তিনি নানা বাড়িতেই বড় হন। ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন, পরবর্তিতে হয়ে উঠেন শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ সহচর ও সহযোদ্ধা। উল্লেখ্য প্রফেসর জালালুদ্দিন আহমেদের প্রিয় ছাত্র ছিলেন এই জিল্লুর রহমান।

১৯৫৭ সালের ৮-১০ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারীতে অনুষ্ঠিত হয় মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর সেই বিখ্যাত কাগমারী সম্মেলন। ইতিহাসে কাগমারী সম্মেলন এদেশের প্রথম সাংস্কৃতিক কাম রাজনৈতিক সম্মেলন। সম্মেলন উদ্বোধণ করেন ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন। উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মূখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক জনপ্রিয় তরুন নেতা ও প্রদেশিক মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। সেই সম্মেলনে নৃত্য পরিবেশন করেন এক অপরূপা সুন্দরী। নাম জেবুন্নাহার আইভি। সেই নাচেই মাতোয়ারা হলেন জিল্লুর। শৈশবে মা-বাবা হারা জিল্লুরের কাছে মুজিব ভাই শুধু নেতাই নন, ফ্রেন্ড-গাইড এ্যান্ড ফিলোসোফার। মুজিব ভাইকে সাহস করে জানালেন তার মনের কথা। সেই নৃত্য শিল্পীকেই তিনি বিয়ে করতে চান। শেখ মুজিব খুশী হয়েই দায়িত্ব নিলেন। সকল খোঁজ খবর নিয়ে একদিন ডাকলেন জিল্লুর কে। বললেন মেয়েটি কে, তুই জানস? তোদের আজন্ম শত্রু চন্ডীবেরের কামাল সরকারের প্রৌ-পুত্র, তোর কলেজের প্রিন্সিপ্যল প্রফেসর জালাল উদ্দিনের ৩য় কন্যা। জালাল মাস্টার পণ করেছেন সিএসপি অফিসার ছাড়া কোন মেয়ের বিয়ে দিবেন না। কিন্তু জিল্লুর হালছাড়তে রাজী নয়। জেবুন্নাহার আইভিকেই তার চাই।

উল্লেখ্য বঙ্গবন্ধুর সমস্ত গুণাবলী নিয়ে কম বেশী লেখালেখি কিংবা গবেষণা হয়েছে। তার হৃদয়ের বিশালতা নিয়ে কিংবদন্তিও কম প্রচলিত নয়। যে কোন সিদ্ধান্তে তার দুরদর্শিতা ও আন্তরিকতা এতটাই ছিল তার সহচররা প্রায় সকলেই ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক জটিলতা নিরসনে তার কাছেই আসতো। তবে বঙ্গবন্ধুর একটি দিক নিয়ে তেমন কোন কাজ হয়েছে বলে জানিনা। সেটি হল ঘটক হিসেবে বঙ্গবন্ধু। ব্যক্তিগতভাবে আমিও প্রায় ডজনখানেক বিয়ের কথা জানি যেগুলোতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন কখনো অনুঘটক, অভিভাবক, সাক্ষী কিংবা উকিল।

যাই হোক নাছেড়বান্দা জিল্লুরকে নিয়ে একটু চিন্তায় পড়লেন মুজিব। কী করা যায়? ৫৪-এ যুক্তফ্রন্টের নিরংকুশ বিজয়ের নেপথ্য কারিগর ছিলেন তরুণ নেতা শেখ মুজিব। ‘হক-ভাসানীর নৌকা’র ক্যাম্পেইনে সারা পূর্ব পাকিস্তান তিনি চষে বেড়িয়েছেন। শুধু আঞ্চলিক নেতাদের নামই নয় প্রায় সকলের পারিবারকেও তিনি চিনতেন হাতের রেখারমত। শেখ মুজিব তখন বাংলার মানুষের কাছে শেখ সাব হিসেবে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচিত সরকার ভেঙ্গে দিয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠন করা হয়। চরম অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে পাকিস্তানের রাজনীতি। মীর জাফরের উত্তর পুরুষ সাহেবজাদা সৈয়দ ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানের গভর্ণর। ৫৮ সালে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের ঘোষণা দিলেন। এদিকে কাগমারী সম্মেলনের পর আওয়ামীলীগ ছেড়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। ভাসানীবিহীন আওয়ামীলীগের নির্বাচনী প্রস্তুতি তখন পুরোটাই নির্ভরশীল হয়ে পরলো শেখ মুজিবের উপর। আসন্ন জাতীয় পরিষদ নির্বাচন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের সাথে নিত্য বৈঠক চলে শেখ মুজিবের। মনোনয়ন নিয়ে দীর্ঘ বাগ বিতান্ডা। বৃহত্তর ময়মনসিংহের মনোনয়নের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু বললেন ভৈরবের বিবাদমান কামাল সরকার ও বালকি মোল্লা এই দুই পরিবারের শত্রুতা যদি মিটিয়ে ফেলা যায় তবে গোটা ভাঁটি অঞ্চল তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহে আওয়ামীলীগ ভালো করবে। জিল্লুর রহমান অবশ্য আগেই তার যোগ্যতা দিয়ে মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত করেছিলেন। আতাউর রহমান বুদ্ধি চাইলেন কি করা যায়? শেখ মুজিব অনেকক্ষণ ভেবে টেবে বললেন আপনার বন্ধুকে যদি রাজী করাতে পারেন তবে তার তৃতীয় মেয়ে আইভিকে আমাদের জিল্লুরের সাথে বিয়ে দেয়া যেতে পারে! উল্লেখ্য মূখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান আবার প্রফেসর জালালের বন্ধু। উত্তম রণকৌশল। ওষুধ টনিকের মত কাজ করলো। পরের দিনই প্রফেসর জালালকে ডেকে পাঠালেন মূখ্যমন্ত্রী। প্রস্তাব শুনে বন্ধুর উপর তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। মুখের উপর না বলে ফিরিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রীকে। কন্যার পতি হবার ন্যুনতম যোগ্যতা ডেপুটি মেজিষ্ট্রেট। হতভম্ব আতাউর রহমান খান অবশেষে দ্বারস্থ হলেন বন্ধু পত্নি হাসিনা বানুর। এবং তাকে পটাতে সক্ষম হলো। আইভি তখন নবম শ্রেণীর ছাত্রী। ১৯৫৮ সালের ২৭ জুন জিল্লুর আইভীর বিয়ে হয়।

তার পরের ইতিহাসতো কম বেশী সবার জানা। শুধু রাজনীতিই নয় বাংলাদেশের নারী জাগরণের ইতিহাসও আইভি রহমানকে বাদ দিয়ে লেখা সম্ভব নয়। ২০০৪ এর ২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমান নিহত হবার পর মিডিয়ার কল্যানে আমরা জানতে পারলাম কী গভীর ভালোবাসা ছিল দুজনের। রাজনীতির এই শুদ্ধ পুরুষ যেদিন রাষ্ট্রপতি হলেন, সেদিন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আর রেহানা তাকে যেভাবে সম্মান দেখিয়েছিলেন বাংলার মানুষ তা অনেকদিন মনে রাখবে এমনকি যারা কট্টর হাসিনা বিরোধী তারাও সেদিন স্যালুট জানিয়েছিল। মহামাণ্য রাষ্ট্রপতির প্রয়াণে রাষ্ট্রীয় শোকে মুহ্যমান বাংলাদেশ। রাজনীতির এই চরম দুঃসময়ে একজন শুদ্ধ রাজনীতিবিদ বিদায় নিলেন কোটি মানুষের শ্রদ্ধাবনত চিত্তের অকৃত্রিম ভালোবাসা নিয়ে। আর আমি ভাবছিঃ যাকে নিজ কন্যার পতি বানাতে আপত্তি ছিল সেই বিদায় নিলেন রাষ্ট্রের পতি হয়ে!