বর্ষবরণ বাঙালির গর্বের ধন

0
931

হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির অনন্য অনুষঙ্গ আমাদের আবহমান নানান ধর্মীয় ও অসাম্প্রদায়িক পালা-পার্বন আর উৎসব। বর্ষবরণ বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় ও বড় সার্বজনীন প্রানের উৎসব। ক্রমবর্ধমান নৈতিক অবয় আর সাংস্কৃতিক বৈকল্যের এইযুগে বুকভরে গর্বকরার বিষয় খুব বেশী আর আমাদের অবশিষ্ট নেই। বাঙালির গর্বের ধন ৫২, ৭১ কিংবা রবীন্দ্রনাথ এমনকি বঙ্গবন্ধু সবই যেন শুধুই ইতিহাস। আর অর্জিত ঐতিহ্যের সকল চেতনাও আজ ক্রময়িষ্ণুমান। একমাত্র ব্যতিক্রম আমাদের বাঙালির বর্ষবরণ উৎসব। দিন যতই যাচ্ছে ততই বাড়ছে এর সার্বজনীনতা তথা এর অসাম্প্রদায়িক চেহারা, এর পরিধির ব্যপকতা। ক্রমবর্ধিষ্ণু এই রঙিন ব্যপ্তি ধর্ম-বর্ণ, জাত-পাত, দলমত এমনকি কাটতাঁর পেরিয়ে সব বাঙালিকেই একই সুতায় বেঁধে রাখে। দিন কিন্তু এমন ছিলনা কিছুদিন আগেও।

বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তান আমলতো বটেই এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশেও কম চেষ্টা হয়নি বর্ষবরণের অসাম্প্রদায়িক চেহারায় কালিম লেপনের। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্ম হিসেবে আমাদের প্রজন্মকেই ধরা যেতে পারে ধর্মান্ধ রাজনীতিবিদদের এই অপচেষ্টার সর্বশেষ শিকার। অপচেষ্টাটি এখনও চলছে তবে তা কিছু কওমী মাদ্রাসা কেন্দ্রীক ও দুর্বলভাবে বিচ্ছিন্নকিছু জায়গায়।

পটুয়াখালীর বিভিন্ন অঞ্চলে নববর্ষের মেলা বসত। আবহমান বাংলা কারুশিল্পের প্রায় সকল পণ্য, লোকজ মিঠাই, শুকনো খাবার, বায়েস্কপ, সাপ ও বানরের খেলা, বাইদানিদের (বেঁদে) নিপুন যাদু, গৃহস্থলী পণ্য, ঘোড়দৌড় সহ গ্রামীণ মেলার প্রায় সকল অনুষঙ্গই থাকত এই মেলায়। থাকতো না শুধু আজকের মত পান্তা ইলিশের আয়োজন। আমাদের কাছে এটি ‘থৌল’ হিসেবে এটি পরিচিত। আমাদের শৈশবে পটুয়াখালী শহরে ‘থৌল’ বসত বর্তমান সৈকত সিনেমা হল সংলগ্ন স্থানটিতে। পরবর্তিতে পিডিএস ময়দান, শহীদ আলাউদ্দিন শিশুপার্ক সহ বিভিন্ন জায়গায়। থৌলে যাওয়ার জন্য আব্দার করে বাবার কাছ থেকে মায়ের হাত ঘুড়ে জুটতো এক থেকে দেড় টাকা।

বাবার পকেট আর মায়ের আঁচল থেকে গোপনে সড়াতাম আরো দু একটি সিঁকি বা আধুলি। তারপরও বন্ধুদের তুলনায় অনেক কম পয়সা নিয়েই যেতাম থৌলে। ফিরতাম কিন্তু রাজার বেঁশে। কেননা আমার মত অনেকের কাছেই থৌল ছিল শৈশবের চুরি বিদ্যার দতার বার্ষিক পরীা। পড়শির গাছের কাঁচা আম চুরি করে ঝিনুক ঘষে তার ধারালো তলদেশ দিয়ে সেই কাঁচা আম ছিলে খেতে খেতে আমরা থৌলে যেতাম। আর ফিরতাম থৌল থেকে চুরি করা লোহার ছুরি দিয়ে অন্যকোন গাছের আম খেতে খেতে। দুই পকেট আর হাত বোঝাই থাকতো নানান খেলনা আর পণ্যে। হাই স্কুলে উঠে আমরা বাসা থেকে পালিয়ে বন্ধুরা মিলে লোহালিয়ায় মেলা দেখতে যেতাম ঘোড়দৌড়ের আকর্ষনে। পালাতে হত প্রধানত একটি কারনেই সেটি হচ্ছে বাসা, মহল্লা আর স্কুলের হুজুরদের ভয়ে। তাদের সকলেরই অভিন্ন বক্তব্য এটি তো হিন্দুদের মেলা। ওখানে যাওয়া খুবই বড় পাপের বিষয়। যদিও পটুয়াখালীর মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বেশ উদার মুসলিম পরিবার। তবুও হুজুরদের সাথে দ্বন্দে যাওয়ার সাহস আমাদের মত ছোটরাতো দুরের কথা অভিভাবকরাও রাখতেন না। একই অভিজ্ঞতা শৈশবের একুশেও। প্রশ্ন ধর্মান্ধদের এত ঔদ্ধত্য এলো কোত্থেকে? তাকাই একটু ইতিহাসের দিকে।

চার হাজার বছর আগে ভারতবর্ষে জীবিকার তাগিদ আর সম্পদের লোভে আর্যরা এসেছিল। ভূমিজ অনার্য আর দ্রাবিড়দের সনাতন সমাজে উৎকৃষ্টতার নামে আর্যরা বৈষম্যমুলক সমাজ প্রতিষ্ঠা করে। যদিও বঙ্গভূমিতে তারা খুববেশী পাত্তা পায়নি। তারপরও তাদের সর্বগ্রাসী প্রভাবে বঙ্গেও স্থায়িত্ব পেল ব্রাম্মনদের পৌরহিত্যে জাত পাত আর বৈষম্য ভিক্তিক সমাজ। জ্ঞানার্জনের অধিকার শুধুই ব্রাম্মনদের। ভগবান গৌতম বুদ্ধ এলো প্রথম আলোকবর্তিকা নিয়ে। কয়েক শতক আলোক দিলেন। ভারতবর্ষ পেরিয়েও সেই অলো ছড়িয়ে পরল গোটা প্যান প্যাসেফিক অঞ্চলে। গোটা ভারতবর্ষে বৌদ্ধ সভ্যতাই মুলত জ্ঞানভিক্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রথম কারিগর। কিন্তু সমাজের মুলকাঠামোতে ব্রাম্মনদের পৌরহিত্য খুব বেশী কমেনি তখনও। মহানবীর মৃত্যুর পর সবচেয়ে আধুনিক সমাজব্যবস্থার ধর্মীয় বাণী নিয়ে বিশ্বময় ছড়িয়ে পরেছিল তার সাহাবীরা। বঙ্গভুমিসহ গোটা ভারতবর্ষে সম্পদের মোহে ভিনদেশীরা বাণিজ্যের জন্যে আসতে শুরু করে খ্রীষ্ট জন্মের পর থেকেই বলা যায়। আরব বণিকদের পথ ধরে ইসলাম প্রচারকরা বঙ্গে আসা শুরু করেন খ্রীষ্টীয় প্রথম সহাস্রব্দের শেষদিকে। দলে দলে দলিত সম্প্রদায় ইসলামকে গ্রহণকরলেন। সুফি সাধকদের অনেক পরে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর মত মুসলিম বীররা তলোয়ার হাতে দেশের পর দেশ জয় করলেন। ভারতবর্ষে শুরু হল পরস্য, আফগান আর তুর্কিদের মুসলিম শাসন।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা পেল জ্ঞান বিজ্ঞান আর শিল্প সাহিত্য। ভারতবর্ষের সবচেয়ে মেধাবী রাজনীতিবিদ মোগল সম্রাট আকবর ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের নানান উদ্যোগ নিলেন। যার অনেক কিছুই পরবর্তিতে ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু কালের যাত্রায় বাংলা সন ও তার উদ্যোগে বাংলা নববর্ষ প্রতিষ্ঠা পেল এই বঙ্গে। বৃটিশ শাসন আমলেও নববর্ষ উদযাপিত হত তবে এতটা অসাম্প্রদায়িক অবায়ব তখনও হয়নি। পাকিস্তান শাসন আমলে বাঙালি সংস্কৃতির উপর একের পর এক আঘাত শুরু হল রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায়। শুধু নববর্ষ নয় এমনকি রবীন্দ্রনাথ ও বাদ পরলো না সেই হিংস্র থাবা থেকে। একের পর এক রাষ্ট্রীয় ফরমান আর ধর্মীয় ফতোয়াবাদ এমন অবস্থা তৈরী করল যেন সকল প্রকার উৎসব-আনন্দ, পালা-পার্বন সব কিছুই হিন্দুস্তানি সংস্কৃতি ও ইসলাম বিরুদ্ধ। বাঙালি সংস্কৃতি মানেই মালোয়ানদের সংস্কৃতি আর এ থেকে মুক্তি পেতেই নাকি পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল। তারপরের ইতিহাস তো সকলেরই জানা। বাঙালির গর্জে উঠার ইতিহাস। যে ইতিহাসের পরদে পরদে ছিল অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন, স্বনির্ভর দেশ গড়ার আঁকুতি। মহানমুক্তিযুদ্ধে আমরা একইসাথে পাক হানাদার ও ধর্মাব্যবসায়ী জামাত শিবির রাজাকারদের পরাজিত করেছিলাম। কত রক্ত, কত জীবন, মা বোনের সম্ভ্রম দিয়ে আমরা পেয়েছি নিজের একটি স্বাধীন দেশ, বাংলাদেশ। অনেক দাম দিয়ে কেনা আমার স্বাধীনতা। আর যেন কোন ধর্মব্যবসায়ী আঘাত আনতে না পারে আমার আমার নববর্ষে, আমার সংস্কৃতিতে, আমার অস্তিত্বে।