নায়ক রাজের এক বৃদ্ধ ভক্ত!

0
1079

ঢাকা চিড়িয়াখানায় আমরা এক বছর ছিলাম। চিড়িয়া হিসাবে নয়, গেটের ইজারাদার ছিলেন বড় ভাইরা, সে সুবাদে তাদের বা নিজেদের হেল্প করতে। সালটা বোধ হয় ১৯৯২-৯৩ । সঙ্গী আমার সব ছেলেবেলার বন্ধু। বাপ্পী, রুমি, পরাগ, নাহিদ, শিমূল, রাব্বি, ইস্তেজা, আরিফ……আরো অনেকে। সিনিয়র বন্ধুদের মধ্যে নয়নদা, মামুন ভাই ও তাদের কয়েকজন বন্ধু। আমরা থাকি পুরানা পল্টনে ‘মৌরুসী’ নামে মহা নস্টালজিক একটা টিনশেড বাড়িতে। কলেজ টু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যবর্তি অনিশ্চিত জীবনের পুরোটাই কেটেছে মৌরুসীতে। এটি আমার সকল ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের প্রিয় শরণার্থী শিবির। আমার কয়েকশত বন্ধুর জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় এই মৌরূসী, যার জাবর কেটে এখনও আমাদের রাতের পর রাত কেটে যায় অনায়াসে।

চিড়িয়াখানায় আমরা নিজেরা টু পাইস কামাই করার জন্য বিভিন্ন প্রাণি ও জীব-যন্তুর ছবি দিয়ে একটা কাগজের ক্যাপ তৈরি করলাম। আমীরুল ভাই (ছড়াকার আমীরুল ইসলাম) ক্যাপের বারান্দায় প্রিন্ট করার জন্য সুন্দর একটা ছড়া লিখে দিলেন। আমরা ছুটির দিনগুলিতে ১০/১২ জন বন্ধু মিলে চিড়িয়াখানায় গিয়ে ক্যাপ বিক্রি করতাম। নির্দিষ্ট কোন দাম নেই, সর্বোচ্চ ভদ্রতা বজায় রেখে কাস্টমার পটিয়ে যে যে দামে বিক্রি করতে পারে। পরফরমেন্সের একটা সরব প্রতিযোগিতা। আমাদের সহজ টার্গেট শিশু ও সুন্দরি কাস্টমার। আমি নিতাম রিস্কিগুলো আর্মি অফিসার, বিদেশি, ভিআইপি..। একদিনের ইনকামে পুরো সপ্তাহের মৌজ ফূর্তির রশদ জুটতো।

আমাদের কাছে ঢাকা চিড়িয়াখানার সবচেয়ে আজব প্রাণিটার নাম আব্দুল্লাহ। পাতিলকালো গয়ের রঙ, দেখতে টেলিসামাদ, অচরণে টেলিসামাদের বাপ, কূটনামিতে এটিএমের দাদা। ওর প্রধান দায়িত্ব প্রাণি যাদুঘরে দর্শক আকর্ষণ করা। ওর ভাষায় মুরগি ধরা। অদ্ভুত একটা মায়াবী সুরে গান গেয়ে, অভিনয় করে দর্শকদের আকর্ষিত করতো।“ ঢাকা-চিড়িয়াখানা, প্রাণি-যাদুঘর, এক প্রাণির কয়টা মাথা, ব্যঙের মাথায় রঙিণ ছাতা…. বিশাল লম্বা কবিতা, যার মধ্যে যাদুঘরের টুকিটাকি কালেকশন ও রসালো উপায়ে ফুটিয়ে তুলতো। সে এক বিরল প্রতিভা।

আব্দুল্লাহ মহাব্যস্ত। নায়ক রাজ রাজ্জাক এসেছে স্যুটিং করতে। স্যুটিং শেষ করে নায়করাজ বেড়িয়ে গেলেন। ময়মনসিংহ এলাকার একটি বৃদ্ধ লোক নাতি নিয়া এসেছে চিড়িয়াখানা দ্যাখতে। নাতিরে একটা ধমক দিয়া দূরে রাইখা খুব ভয়ে ভয়ে আব্দুল্লাহর কাছে গিয়ে বলে, ‘রাজ্জাক স্যার কি এ বাড়িত থাকেন?’ আব্দুল্লাহতো বুইঝা গেল বড় মুরগী আজকে পাইছে। ‘সে আবার কই থাকবো, এখানেই তো থাকে, দ্যাখেন নায় লুঙ্গি পড়া ছিল।’ সে লোকতো আব্দুল্লাহর এখন হাত ধরে কতক্ষণ, কতক্ষণ পা ধরে..…তার জীবনের বড় স্বপ্ন নায়ক রাজকে নিজ হাতে একটু ছুঁয়ে দেখবে! বিনিময়ে সে যে কোন কিছু করতে প্রস্তুত। আব্দুল্লাহ বিশাল এক ভাব নিলো। ‘দ্যাখলেন না স্যার বাইরে গ্যাছে, অনেক রাতে ফিরবে। দু একদিন পর সকালে আন, দেখা করাইয়া দিমু, ছুইয়াও দ্যাখতে পারবেন। এখন দু-একশো ট্যাকা যা আছে দিয়া যান।’ বৃদ্ধ সরল মনে বাড়ি যাওয়ার ভাড়া বাদে সব টাকা আব্দুল্লাহরে দিয়া গেল।

ঠিক দুইদিন পর এবার এসেছে বৃদ্ধ বউ নিয়ে। বিশাল দুইটা ব্যাগ আর সাজি ভরা নিজ হাতালের কয়েকটা রাওয়া মুরগী-ডিম, নিজ গাছের কলার ছরা, পেপে, পেয়ারা, বিভিন্ন সব্জি, পিঠা…। আব্দুল্লাহ দেখা মাত্রই,
“আরে চাচা আপনে আর আওয়ার দিন পাইলেন না, স্যারে তো ১ ঘন্টা আগে কক্সবাজার গেছে। আহারে আইজগো তো আবার নানীরেও লইয়াইছেন দ্যাখি। আচ্ছা অসুবিধা নাই ভালোবাইসা যা আনছেন রাইখা যান, স্যাররে দিমু আনে। আর বুঝেনই তো এ লাইনে পয়সা ছাড়া কিচ্ছু হয় না। পকেটতো একটু ভারী কইরাই আনছেন মনে হয়, ক্যাশপাতি যা আনছেন দিয়া যান। কয়েক দিন পর আসেন আপ্নার মনের আশা পূরণ করাইয়া দিমু আনে।”

পাক্কা দুই বছর প্রায় প্রতি সপ্তাহে বৃদ্ধ আসতেন তার সর্ব্বোচ্চটা নিয়ে। আর আব্দুল্লাহ নিত্য নতুন অভিনব সব ফন্দি করে সর্বস্ব কেড়ে নিত বৃদ্ধ ভক্তের। আব্দুল্লাহ বললো ভাই কয়েক মাস ধইরা তো আইতেসে না, মনে হয় মইরা গ্যাছে বুইড়া।
বিদায় নায়ক রাজ।