‘জুবিলী স্কুল’-দক্ষিণের বাতিঘর, প্রেক্ষিতঃ বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ বিকাশে বিদ্যায়তনের অবস্থান

0
1325

আধুনিক সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিনির্মাণে মধ্যবিত্ত সমাজই সব দেশে, সবকালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ‘মধ্যশ্রেণী একটি জাতির মেরুদন্ড। অন্যান্য পেশাজীবী শ্রেণী জাতির হাত-পা প্রভৃতি। যেমন কৃষকসমাজ একটি জাতির অর্থনৈতিক মেরুদন্ড। সমাজের যাবতীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ড পরিচালিত হয় মধ্যশ্রেণীর দ্বারা। রাষ্ট্র পরিচালনা ও প্রশাসনে তারাই প্রধান। শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তারাই সব। সমাজের যত বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাপার রয়েছে, সেগুলোতে মধ্যশ্রেণীর ভূমিকাই মুখ্য। জাতির আশা-আকাক্সক্ষা-স্বপ্নকে বাস্তবায়নের কাজটি মধ্যশ্রেণীই করে থাকে। মধ্যবিত্ত হলো সমাজের নেতৃত্বদানকারী শ্রেণী।’১

ওয়েবারিয়ান তত্ত্বমতে মধ্যবিত্তরা হচ্ছে না শ্রমিক, না অভিজাত। মার্কসবাদে এদের স্থান হচ্ছে শাসক শ্রেণীর নিচে ও প্রোলেতারিয়েতদের ওপরে। হালে, যখন ধ্রুপদী বিভাজন ঝাপসা হয়ে এসেছে, মধ্যবিত্তের নতুন সংজ্ঞা পাওয়া যাচ্ছে। যেমন ভারতীয় নগরাঞ্চলে মধ্যবিত্ত বলা হয় তাদেরই যাদের নিজস্ব ভূমিতে নিজস্ব বাড়ি আছে। আবার যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে মধ্যবিত্ত হতে হলে কেবল নিজভূমে বাড়ি থাকলেই চলবে না, এর সঙ্গে ব্লু কলার জব, নিজের গাড়ি, সন্তানকে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর সামর্থ্য এবং মাঝে মাঝে অবকাশ যাপনের সুযোগ থাকতে হবে। এডিবি ২০০৫ সালের ক্রয়ক্ষমতার সমতার (পিপিপি) নিরিখে দৈনিক দুই থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত যারা খরচ করতে পারে, তাদেরই মধ্যবিত্তের কাতারে ফেলেছে। (বর্তমানে এক পিপিপি ডলার=১৭ টাকা)। বাংলাদেশে বিবিএসের নতুন জরিপ অনুসারে মোট পরিবারের মধ্যে ৫৪ শতাংশ মধ্যবিত্ত পরিবার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শুধুমাত্র বিত্তের বিচারে মধ্যবিত্ত চিহ্নিত নয়; এর সাথে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সংশ্লিষ্টতা অনিবার্য। কেননা সমাজের প্রায় প্রান্তসীমায় অবস্থিত অনেকের আয় অনেক মধ্যবিত্তের চেয়ে বেশী হলেও (যেমন কিছু সিএনজি বা রিক্সা চালক) তাদের শ্রেণী উত্তোরণ ঘটে না। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে এই শ্রেণীটিই সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল চালিকা শক্তি। ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও তাই নির্বাচনের আগ মুহূর্তে নিজেকে মধ্যবিত্ত বলে ঘোষণা করেছিলেন।’২

বাঙালি মধ্যবিত্তের বিকাশের ইতিহাস পটুয়াখালী জুবিলী স্কুুলের ইতিহাসের চেয়ে খুব বেশী প্রাচীন নয়। অন্তত স্থানীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণীসত্তার উদ্ভব এই স্কুলটিকে কেন্দ্র করেই। স্বভাবতই প্রশ্ন আসতে পারে একটি স্কুলের ইতিহাসের সাথে একটি জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী বিকাশের ইতিহাস তুলনা আদৌ সমীচীন কিনা! স্বল্প পরিসরে বঙ্গের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো।

আবহমান কালথেকেই বাংলা ছিল সম্পদশালী। এই সম্পদের লোভে হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভাগ্যন্বেষী মানুষ এসেছে বাংলায়। এরা প্রায় সকলেই এসেছে ধর্মগ্রন্থ হাতে নিয়ে কিন্তু সবারই লক্ষ্য ছিল নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন। বৈদিক যুগ থেকে মধ্য-এশিয়ার যাযাবর আর্যরা এসেছিল সনাতন ধর্মের বাণী নিয়ে উত্তর ভারতের পথ ধরে। এক হাতে বেদ অন্যহাতে জাতপাত তত্ত্ব (ডিভাইড এন্ড রুল)। আর্য প্রবর্তিত ব্রাম্মন্যবাদ গোটাভারতবর্ষে জাতপাত নির্ভর যে সমাজ ব্যবস্থার ভিক্তি গড়ে তুলেছিল তার রেশ অদ্যোবধি পর্যন্ত কিছুটা হলেও বহমান। আর্য আগমনের প্রায় ১০০০ বছর পরে সংস্কৃত ভাষার জন্ম হয়। গুরু গৃহে শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ হত। পরবর্তীতে উপসানালয় ও টোলভিক্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়। গাছের পাতা ও বাঁশের কঞ্চি ছিল শিক্ষার উপকরণ। ৭০০ খ্রীষ্টপূর্ব সময় বাংলা মোটামুটি ৪টি বৃহৎ রাজত্বে বিভক্ত ছিল: মগধ, পুন্ড্র, বঙ্গ ও রাঢ়। বগুড়ার শিবগঞ্জে অবস্থিত মহাস্থানগড় পুন্ড্রের রাজধানী ছিল। বাঙ্গালী রাজপুত্র বিজয় সিং কর্তৃক শ্রীলংকায় রাজত্ব স্থাপন (৫৪৪ খ্রি.পূ.)। আরেক বাঙালি গদাধর জয় করেন মাদ্রাজ। গ্রীক ঐতিহাসিকদের নিকট পেরিপ্লাস গ্রন্থ ও টলেমির বিবরণ থেকে জানা যায় গঙ্গার শাখা-প্রশাখার তীরে অবস্থিত গঙ্গারিডির শৌর্য-বীর্যের কথা শুনে মহাবীর আলেকজান্ডার উপমহাদেশের ভিতরে প্রবেশ করার সাহস না পেয়ে বিপাশা নদীর তীর থেকে ফিরে যান। অধুনা (২০০৬) আবিস্কৃত উয়ারি-বটেশ্বর অঞ্চলের প্রাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী গঙ্গারিডির এখানেই অবস্থান ছিল বলে ধারণা করা হয়। গঙ্গারিডি ও প্রাসীতে তখন নন্দ রাজবংশ। খ্রিস্টপূর্ব ৬ শতকে রাষ্ট্রের ধারণা জন্মে। রাষ্ট্র প্রধান ¯্রষ্টার প্রতিনিধি। পুরোহিতরাই তার সভাসদ ও সমাজের মূল কর্তাব্যক্তি। ব্রাম্মন্যবাদের এমন অত্যাচারে জনগণ নাভিশ্বাস ফেলছিল। তখন জন্ম নেয় বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম। খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৩ অব্দে উত্তর-পূর্ব ভারতের কপিলাবাস্তু নগরীর ক্ষত্রিয় রাজা শুদ্ধোধন এর ঘরে জন্ম নেন সিদ্ধার্থ (গৌতম বুদ্ধ)। তার প্রবর্তিত বৌদ্ধ ধর্মের অহিংস নীতি ভারতবর্ষজুড়ে প্রতিষ্ঠিত ব্রাম্মন্যবাদনির্ভর সনাতন ধর্মে তীব্র আঘাত হানে। মগধ সাম্রাজ্যের অধীনে বাংলা ঐক্যবদ্ধ হয়।

সে সময়ে ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় তক্ষশিলা। ইসলামাবাদের ৩০ কি.মি. দূরে প্রাচীন গান্ধার রাজ্যের রাজধানী ছিল তক্ষশিলা (খ্রিপূ.৭শতক-খ্রি. ৯শতক)। খ্রি.পূ ৪১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত তক্ষশিলা বিদ্যাপীঠে ১টি লাইব্রেরিও ছিল, যেখানে অসংখ্য তাল পাতার লেখ্য ছিল। ঐ সংগ্রহশালায় হিন্দুইজম, রাজনীতি, সাহিত্য, মেডিসিন আর দর্শনের অনেক উপাদান ছিল। এখানকার শিক্ষার উঁচু মানের জন্য বৈদিক শিক্ষার কেন্দ্র হলেও এখানে চানক্যের মতো কৌশলবিদরাও শিক্ষকতা করেছেন যিনি পরবর্তীতে আচার্য্যও হয়েছিলেন। এছাড়া সংস্কৃতি ব্যাকারনের জনক পানিনিও এখানকার শিক্ষক ছিলেন। পঞ্চম শতকের মাঝামাঝি সময়ে এটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এটা কোন বর্বর ব্যক্তি বা গোষ্ঠি কর্তৃক এ উপমহাদেশের মহামুল্যবান জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা ধংসের ১ম নিদর্শণ। নন্দরাজের সামরিক কর্মকর্তা চন্দ্রগুপ্ত ব্যর্থ অভ্যুত্থানের কারনে বন্ধানের জঙ্গলে পলাতক ও নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন। তক্ষশিলার বিখ্যাত শিক্ষক চানক্য যাকে কৌটিল্য বলা হয় তিনিও নন্দরাজ কর্তৃক অপমানিত হয়ে একই জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। ঘটনাক্রমে তাদের সাক্ষাত ঘটলে চানক্য তার দূরদর্শীতা আর কৌশলে চন্দ্রগুপ্তকে সিংহাসন (৩২৪-৩২০) এনে দেয়। খ্রিস্টপূর্ব ৩২১ সালে প্রথম সর্বভারতীয় রাষ্ট্র মৌর্য সা¤্রাজ্য স্থাপন করেন চন্দ্রগুপ্ত। এ সময়েই আর্যরা ব্যাপকভাবে বাংলায় প্রবেশ করে। চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র বিন্দুসার (৩০০-২৭৩ খ্রি.পূ.) অমিত্রঘাত উপাধি নিয়ে মগধের সিংহাসনে বসেন। তিব্বতীয় ঐতিহাসিক তারানাথের মতে বিন্দুসার সুদূর দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত স¤্রাজ্য বিস্তার করেন। বিন্দুসারের মৃত্যুর পর মহামতি অশোক মগধের সিংহাসনে বসেন। কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে মৌর্য সা¤্রাট অশোক (২৬৯-২৩২ খ্রি.পূ) বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন।

পৃথিবীর প্রাচীনতম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দা স¤্রাট অশোক কর্তৃক নির্মিত বলে ধরা হয়। এর স্বর্ণযুগে ১০,০০০ এর অধিক শিক্ষার্থী এবং ২,০০০ শিক্ষক এখানে জ্ঞান চর্চা করত। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারটি ছিল একটি নয়তলা ভবন। তৎকালীন জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল শাখাতেই চর্চার সুযোগ থাকায় সুদূর কোরিয়া, জাপান, চীন, তিব্বত, ইন্দোনেশিয়া, পারস্য এবং তুরস্ক থেকে জ্ঞানী ও জ্ঞান পিপাসুরা এখানে ভীড় করতেন। স¤্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেয়ার পর খ্রিস্টপূর্ব ২৭৮ সালে গঠন করলেন ৯ সদস্যের একটি দল-পৃথিবীর ইতিহাসের সবচাইতে গোপন। যাদের দায়িত্ব ছিল জ্ঞান সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণ করা। তাও এমনসব জ্ঞান যা সাধারণ মানুষের কাছে বা ভুল মানুষের হাতে গেলে তা হতে পারে মানবসভ্যতার জন্য হুমকি। নয়জনে লিখলেন নয়টি বই যাতে যুক্তিক্ষতগত করা হলো কিছু বিদ্যা। ১.প্রপাগান্ডা ও সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার ২.ফিজিওলজি ৩.মাইক্রোবায়োলজি ৪.আলকেমি ৫.কমিউনিকেশন ৬.গ্র্যাভিটেশন ৭.কসমোলজি ৮.লাইট ৯.সোসিওলজি।

চতুর্থ হতে ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত গুপ্ত রাজবংশ বাংলা শাসন করেছিল। এই যুগ ছিল আবিষ্কার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বাস্তুুবিদ্যা, শিল্প, ন্যায়শাস্ত্র, সাহিত্য, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ধর্ম ও দর্শনের বিশেষ উৎকর্ষের যুগ; বর্তমান হিন্দু সংস্কৃতি মূলত এই যুগেরই ফসল। এর ঠিক পরেই শশাঙ্ক নামের একজন স্থানীয় রাজা স্বল্প সময়ের জন্য এ এলাকার ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হন। প্রায় একশ বছরের অরাজকতার (যাকে মাৎসন্যায় পর্ব বলে ইতিহাসে অভিহিত করা হয়) শেষে গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত স¤্রাট বৌদ্ধ ধর্মালম্বী গোপালের (৭৫০ সালে) মাধ্যমে বাংলায় প্রতিষ্ঠা পায় পাল রাজত্ব। পাল রাজবংশের শাসনের সময় বাংলায় ছিল স্বর্ণযুগ। এ সময়ই বৌদ্ধ ধর্ম বিস্তার লাভ করে তিব্বত, ভূটান আর মিয়ানমারে। পাহাড়পুরের সোমপুর বিহার এ রাজবংশের এক অনন্য সৃষ্টি। পালদের পরে এ অঞ্চলে আসে সেন রাজত্ব (দ্বাদশ শতক)। তারাই বাংলার সীমানা বিস্তৃত করেন বিহার, আসাম আর উড়িশ্যা পর্যন্ত। সেনরা ছিলেন হিন্দু এবং তারাই এ অঞ্চলে সংস্কৃত ভাষার সূচনা করেন। অনেকের ধারণা সংস্কৃত গ্রন্থ গীত গোবিন্দ এই সময়েই রচিত হয়। এরপর শুরু হয় মুসলমান শাসন।

১১৯৩ সালে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজী নালন্দা মহাবিহার ধ্বংস করে ফেলেন; এই ঘটনাটি ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের পতনের সূচক হিসেবে গণ্য করা হয়। পারস্যের ইতিহাসবিদ মিনহাজ তার তাবাকাতে নাসিরি গ্রন্থতে লিখেছেন যে হাজার হাজার বৌদ্ধ পুরোহিতকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় কিংবা মাথা কেটে ফেলা হয়; খিলজি এভাবে এই অঞ্চল থেকে বৌদ্ধধর্ম উৎপাটন করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। নালন্দা মহাবিহারের গ্রন্থাগারটি মাসের পর মাস ধরে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়।৩

মূলত বাঙালি সভ্যতা ও সংস্কৃতি বৌদ্ধ শাসনের কাছে ঋণী। ‘প্রাচীন বাংলার বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি এদেশের মাটি ও মানুষকে নিরবচ্ছিন্নভাবে স্পর্শ করেছে। বৌদ্ধ সংস্কৃতির মানবতাবাদী ভাবধারা, চিন্তাভাবনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প-সাহিত্য, স্থাপত্য এমনিভাবে বাঙালি হৃদয়কে স্পর্শ করেছে, যা কালে কালে বিপুল জনমানবের মৃত্তিকাঘনিষ্ঠ এক বিশাল সংস্কৃতির আধার হয়ে উঠেছে। বাংলার সেই প্রাচীন পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, মহাস্থানগড়, বিক্রমশীলা (অতীশ দীপাঙ্কর যার আচার্য ছিলেন), ভাসুবিহার, ময়নামতি শালবন বিহার প্রভৃতিতে- বৌদ্ধ দেব-দেবী, জাতক কাহিনী, বুদ্ধ ও বোধিসত্তের চিন্তাভাবনার প্রতীক অপূর্ব শিল্প-স্থাপত্য এবং সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখা যায়।’৪ এর পাশাপশি সনাতন হিন্দু ধর্মালম্বীরাও শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান রাখে। কিন্তু টোল কেন্দ্রিক এই সুবিধা শুধুমাত্র ব্রাম্মন শ্রেণীর জন্য। অন্তজ্য শ্রেণীর হিন্দুদের বিদ্যার্জন তো দূরের কথা বেদ শ্রবনও তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। জাতপাতে বিভক্ত হিন্দুসমাজের অভ্যন্তর থেকে একটি সংস্কার আন্দোলন অনিবার্য হয়ে পড়ে। সেই সংস্কার আন্দোলনের প্রাণপুরুষ হয়ে উঠলেন শ্রীচৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৪)। ওই মহান বৈষ্ণবগুরুর সেই জাতবিরোধী মানবিক আন্দোলনের পিছনে সক্রিয় ছিল সুফিবাদী ধ্যানধারণা।

খ্রিষ্টিয় প্রথম সহ¯্রাব্দের শেষের দিকে সুফি ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে বাংলায় ইসলামের প্রবর্তন ঘটে। ইসলামী সাম্যবাদের পতাকাতলে দলে দলে লোক যোগ দিতে শুরু করে। ‘ভারতবর্ষে সুফিবাদ চিশতিয়া, সুহরাওয়ার্দি, কাদিরিয়া, নকশবন্দিয়া, কলন্দরিয়া ইত্যাদি নানা তরিকায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে শরফউদ্দীন আলী কলন্দর প্রতিষ্ঠিত কলন্দরিয়া তরিকাটি অবশ্য চৌদ্দ শতকে বিকাশ লাভ করেছিল। নকশবন্দিয়া তরিকাও চতুর্দশ শতকে বিকাশ লাভ করে। নকশবন্দিয়া তরিকার প্রাণপুররুষ ছিলেন খাজা বাকিবিল্ল­াহ। তবে ভারতবর্ষে চিশতিয়া তরিকাই সবচেয়ে জনপ্রিয় আজও। চিশতিয়া তরিকার প্রধান ছিলেন খাজা মঈনউদ্দিন চিশতি (১১৪২-১২৩৬)। ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে ইনি ‘খাজাবাবা’ নামে বিখ্যাত। সুলতান শেখ বাহাউদ্দীন জাকারিয়া (১১৬৯-১২৬৬) ছিলেন সুহরাওয়ার্দি তরিকার পীর। সয়খ আবদুল কাদির জিলানী (১০৭৮-১১৬৮) ছিলেন কাদিরিয়া তরিকার পীর। ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে ইনি বড়পীর নামে পরিচিত। বাংলায় সুফিবাদ বিকাশ লাভ করার পিছনে এইসব সুফিসাধকদের গুররু¡পূর্ণ ভূমিকা ছিল।’৫ ১২০৪ সালের দিকে তুর্কী বংশোদ্ভূত সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী রাজা লক্ষণসেন কে পরাজিত করে তার রাজধানী নবদ্বীপ দখল করেন । এসময় থেকেই বাংলার ইতিহাসের মধ্যযুগের সূচনাধরা হয়। তুর্কী আর পাঠান শাসনের পর বাংলায় মোঘল সাম্রাজ্য স্থাপিত হয় ষোড়শ শতকের দিকে। ষোড়শ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আসার আগে পর্যন্ত বাংলা সুলতান ও স্থানীয় ভূস্বামীদের হাতে শাসিত হয়। মোঘল বিজয়ের পর ঢাকায় বাংলার রাজধানী স্থাপিত হয় এবং এর নামকরণ করা হয় জাহাঙ্গীর নগর। সুলতানী আর মোঘল আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নততর চর্চা হয়। যদিও আপামর জনসাধারণের সম্পৃক্ততা তাতে তেমন ছিল না।

বাঙলায় আবহমান কাল থেকেই পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে সাধারণ জনগোষ্ঠির সামাজিক অবস্থান নির্ণয় করার চেষ্টা হয়েছে। সেনযুগে রাজা বল্ল­াল সেনের আমলে ছত্রিশটি জাত সৃষ্টি করে ছত্রিশটি আলাদা মর্যাদা তৈরি করা হয়েছিল। সমাজে এভাবে ছত্রিশটি প্রধান পদবীর সৃষ্টি হয় পেশাগুণে। এর পর ৩৬টি জাতে আরো শত রকম বিভাজন ঘটে এবং শত শত পদবীর সৃষ্টি হয় বাংলার সমাজে। এই সব শত শত পদবীর উত্তরাধিকারত্ব লাভ করেছে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালি বৌদ্ধ, বাঙালি হিন্দু এবং বাঙালি মুসলমান। তাই চৌধুরী, তালুকদার, বিশ্বাস, মজুমদার, খান, মলি, মুন্সি, সরকার, সরদার প্রভৃতি প্রায় সকল পেশাগত সামাজিক পদবী রয়েছে হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ স¤প্রদায়ে প্রায় সমানভাবে। শেখ, সৈয়দ, প্রভৃতি বংশ পদবী বাঙালি মুসলমান সমাজকে আশরাফ এবং আতরাফ এইদুই শ্রেণীতে বিভক্ত করে বাঙালি মুসলমান সমাজে শ্রেণী বৈষম্য সৃষ্টি করেছিল। এদেশের সাধারণ মুসলমানকে বলা হতো আতরাফ যার আভিধানিক অর্থ নীচুু বংশ- নীচু বর্গের লোক। শেখ, সৈয়দ, মোগল, পাঠান, কাজী, গাজী, শাহ, মিঞা, মীর্জা, মোল্ল­া, খন্দকার ইত্যাদি কয়েকটি ভিনদেশী পদবী যা উপমহাদেশে মুসলমান আগমনের সাথে জড়িত সে কয়টি পদবী বাদে বাংলার অধিকাংশ পদবীই হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রায় সকল ধর্মে ও বর্ণে সুলভ। বাস্তবতা হচ্ছে বংশ পদবী যাই হোক না কেন উনবিংশ শতাব্দির বাংলায় নব জাগরণের আগ পর্যন্ত সমাজব্যবস্থায় শাসক ও শোষিত মূলত এই দুটি শ্রেণীরই অবস্থান ছিল। বৌদ্ধ, হিন্দু কিংবা মুসলিম-সবযুগেই শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার নিমিত্তে যে সকল বিদ্যায়তন সৃষ্টি হয়েছিল তার আলোতেই উজ্জ্বল হয়েছে শ্রেণী চেতনা।

ইউরোপে মধ্যবিত্ত ধারণাটি প্রতিষ্ঠা পায় ফরাসি বিপ্লবের পরপরই। আর আমাদের দেশেও উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে গড়ে উঠা বঙ্গীয় রেঁনেসাই আধুনিক বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের ধারণা সুসংহত ও বিকশিত করে। বাংলায় এ নবজাগণের নেপথ্য কারিগর ছিলেন রামমোহন রায়, ডিরোজিও ও তাঁর বিপ্ল­বী শিষ্যবৃন্দ, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর অনুসারীগণ, অক্ষয়কুমার দত্ত , ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখ। শ্রীরামপুরের ব্যাপটিস্ট মিশন (১৮০০), ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০), হিন্দু কলেজ (১৮১৭), ক্যালকাটা স্কুলবুক সোসাইটি(১৮১৭), কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ (১৮৩৫), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-এর (১৮৫৭) মতো প্রতিষ্ঠানগুলি ছিল বাংলার নবজাগরণে সূতিকাগার। কিন্তু বিভিন্ন সামাজিক ও ঐতিহাসিক কারণে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের বিকাশ অভিন্ন ধারায় হয় নি। ‘বাংলাদেশে মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর যখন অভ্যুদয় ঘটিতেছে তখন হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী সমাজের সমস্ত সুখস্বাচ্ছন্দ্য আত্মসাৎ করিয়া সমাজসত্তাকে পর্যন্ত আপনকার শ্রেণী মানসের মাধুরী মিশাইয়া রচনা করিয়াছে। শ্রেণী হিসাবে প্রতিযোগিতায় মুসলমান মধ্যবিত্তের এই থাকাটা ইংরেজ শাসক শ্রেণীরই কর্মফল।’৬

১৭৫৭-তে যখন ইংরেজরা বাংলা অধিকার করে তখনও বহিরাগত ও দেশী ধর্মান্তরিত মিলিয়ে সকল মুসলমান সংখ্যালঘু। এটা বিস্ময়কর যে, ব্রিটিশ শাসনকালের একশত বৎসরের ভিতরে মুসলমান জনগোষ্ঠী বাংলায় সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীতে পরিণত করে। ১৮৭২ সালে প্রথম আদমশুমারী বা লোকগণনায় বাংলা ভাষাভাষী বাংলায় মোট জনসংখ্যা ৩,৬৭,৬৯,৭৩৫ তারমধ্যে মুসলমান ১,৬৩,৭০,৯৬৬ ও হিন্দু জনসংখ্যা ১,৮১,০২,৩৪৮। কিন্তু ১৮৯১ এর লোকগণনায় মুসলমান ১,৯৫,৮২,৪৮১ ও হিন্দু ১,৮০,৬৮,৬৫৫। ব্রিটিশ শাসনামলে এসে সংখ্যালঘু মুসলমানদের এভাবে সংখ্যাগুরু জনসংখ্যায় পরিণত হবার তাৎপর্য ও ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দূর প্রসারী। এর কারন হিসেবে বলা হয় হিন্দুদের নিষিদ্ধ বিধবা বিবাহ প্রথা, জনপ্রিয় সন্যাসব্রত ও হিন্দুঅধ্যুষ্যিত উত্তর-পূর্ব বাংলায় দুর্ভিক্ষ ও মহামারি। কিন্তু বাংলায় মুসলমান সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষা, দীক্ষায় অনেক পিছিয়ে পড়েছিল। এর অন্যতম কারন হল রাজনৈতিক ও কিছুটা ধর্মীয়।

‘বাংলায় মুসলিম শাসনামলে বাগদাদের আব্বাসীয় খেলাফতের (৭৫০-১২৫৮) শিক্ষার আদর্শকে অনুসরন করত। শিক্ষার প্রধান মাধ্যম ছিল রাজভাষা ফারসি। বিশেষত মোঘল আমলে বাংলা তথা ভারতে ফারসি শিক্ষার গুনমানও একটা উৎকর্ষ সাধন করেছিল যা তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ববোধের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিল। উনিশ শতকের প্রথমভাগে এদেশে যখন ইংরেজির মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষার সূচনা হয় তখন মুসলমানরা অনেকটা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ববোধ থেকে ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষা গ্রহণে অনীহাপোষণ করে। তাছাড়াও তৎকালীন আর্থ সামাজিক অবস্থা ও সরকারের পক্ষপাতমূলক আচারণও মুসলমানদেরকে আধুূনিক শিক্ষায় পিছিয়ে রেখেছিল।’৭ উনিশ শতকে বাংলায় তিতুমীর(১৭৮২-১৮৭১), শরীয়াতুল্লাহ(১৭৮১-১৮৪০), দুদু মিয়া (১৮১৯-১৮৬২) প্রমুখের নেতৃত্বে বৃটিশ বিরোধী জিহাদ আন্দোলন দানা বাঁধলে ইংরেজি শিক্ষাকে হারাম বলে প্রচারণা চালানো হয়। পর্তুগীজ ও ব্রিটিশ খ্রিষ্টান মিশনারীগুলো এ সময়ে প্রচুর নি¤œবর্গীয় হিন্দু ও দারিদ্রপীড়িত অনেক আদিবাসীদের ধর্মান্তরিত করেন। ‘১৮১৮ সাল পর্যন্ত খ্রিষ্টান মিশনারীগুলো কর্তৃক বাংলায় ১৮০টি স্কুল স্থাপিত হয়। যেগুলোর ছাত্র সংখ্যা ছিল ১৩৩৪৭’।৮ ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ সরকার ফারসির পরিবর্তে ইংরেজিকে শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করে এবং ১৮৩৭ সালে ইংরেজিকে রাজভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৪৪ সালে সরকারি চাকরির যোগ্যতা হিসেবে ইংরেজি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। বাংলার হাজার হাজার মুসলিম বেকার হয়ে একবারে পথের ভিখারী হয়ে বসে। হিন্দুরা এর গুরুত্ব অনুভব করে তাদের ইংরেজি শিখে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন করে ও ইংরেজদের ¯েœহভাজন হয়ে ওঠেন।৯ ১৮৫৪ সালে চার্লস উড কর্তৃক উডস্ ডেচপাচ অন এডুকেশন প্রকাশিত হয় যা ব্রিটিশ ভারতে শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা আখ্যা দেওয়া হয়। এর ভিক্তিতেই ১৮৫৭ কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। উডস্ ডেচপাচের ফলশ্রুতিতে গ্রামে গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয় এবং স্বল্প বিত্তের মুসলিম পরিবারের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার সুযোগ পায়। শিক্ষায় সরকারি অর্থব্যয়ের পরিমান ১৮৫৭ সালে ছিল ২১.৬ লক্ষ ১৮৮১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭২.৯১ লক্ষ টাকায়।১০ ১৮৫৬ সালে বাংলার ৩৪টি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিন্দু ছাত্র সংখ্যা ছিল ৬৩৩৮ জন এবং মুসলিম মাত্র ৭৩১ জন। ‘১৮৩৭ থেকে ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত নূন্যাধিক এই পঁচিশ বছর মুসলমান সমাজের পতনের চূড়ান্ত কাল ছিল। এ সময় পর্যন্ত সমাজ ছিল কান্ডারী শূন্য। ছিন্ন পাল, ভগ্ন হাল নিয়ে তা অকূলে ভেসে গেছে। এদিকে হিন্দু সমাজের গতি প্রকৃতি ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত।’১১ ১৮৮৫ সালে ভারতীয় কংগ্রেসের জন্ম হলে হিন্দুরা রাজনৈতিকভাবে আরো এগিয়ে যায়। তারপরেও আবাদুল লতিফ (১৮২৮-১৮৯৩), সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৮-১৯২৮), সৈয়দ আমীর হোসেন (জ. ১৮৪৩) প্রমুখ মুসলিম প্রাগ্রসর ব্যক্তিত্ব মুসলিম সমাজকে পাশ্চত্য শিক্ষায় অগ্রহী করে তোলে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে ঢাকা রাজধানী হয়। ঢাকাকে কেন্দ্র করে বাঙলার মুসলিম সমাজ আত্মোন্নয়নের আশায় বুক বাঁধে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথসহ পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বুদ্ধিজীবিরা বঙ্গভঙ্গ রদের দাবীতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুললে ভারতবর্ষের মুসলমানগণ প্রথমবারের মত রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনিয়তা অনুভব করে। ফলশ্রুতিতে ১৯০৫ সালে স্যার সলিমুল্লাহ, মাওলানা আকরাম খাঁ প্রমুখের নেতৃত্বে ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের জন্ম হয়। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে বাংলার মুসলমানরা আত্মোন্নয়নের অধিকারে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখপাধ্যায়সহ কলকাতা কেন্দ্রিক অনেক প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবি বাবুদের প্রতিবাদের পরেও বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণী গঠনের মানসেই ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

কলকাতা কেন্দ্রিক বাংলা নবজাগরণের ঢেউ দক্ষিণ বাংলায়ও এসেছিল তবে মন্থর গতিতে। বঙ্গের অন্যান্য অংশের ন্যায় দক্ষিণ বঙ্গের বিকাশ সমগতিতে হয়নি। বৌদ্ধ সংস্কৃতির কোন প্রভাবই এখানে পরে নি কেননা এখানকার ভূমি গঠনই হয়েছে তার অনেক পরে। ‘প্রথম শতাব্দীতে খুলনার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং ফরিদপুরের কোটালীপাড়া ও তৎসংলগ্ন এলাকা সমদ্রস্নাত হয়ে সবে মাথা উঁচু করে জনবসতির উপযোগী হয়েছে।’১২ বৃহত্তর বরিশলের প্রায় সমগ্র অঞ্চলই সুদীর্ঘকাল সুন্দর বনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের অংশ ছিল। বঙ্গাব্দ ৬০৬ সালে দনুজমর্দন দে সমুদ্র উপকূলে সুগন্ধা নামের নদীর মোহনায় যে রাজ্য স্থাপন করে তাই পরবর্তীতে চন্দ্রদ্বীপ নাম লাভ করে। বাউফলের কচুয়ায় তার রাজধানী নির্মীত হয়। মগ আর পর্তুগীজ জলদস্যুদের উপর্যুপরি হামলায় রাজধানী কচুয়া উত্তরে মাধবপাশায় স্থানান্তরিত করে। আরব বণিকদের পথ ধরে হযরত শাহ্ সাইয়েদুল আরেফিন (রহ) ১৪ শতকের শেষদিকে ইসলাম প্রচারে কালিশুড়ি আসেন। তার হাতধরেই দক্ষিণ বঙ্গে ইসলাম প্রতিষ্ঠা পায়। ধারণা করা হয় ইতিহাসের বাকলা বন্দর এখানেই অবস্থিত ছিল। ‘পটুয়াখালীতে মুসলিম রাজত্ব সুলতান রুকুনুদ্দিন বারবাক শাহের (১৪৫৯-১৪৭৪খ্রিঃ) রাজত্বকালেই ১৪৬৫ খৃষ্টাব্দে স্থাপিত হয়েছিল। ১৬১১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে পটুয়াখালী এলাকা মোঘল অধিকারে আসে। চন্দ্রদ্বীপ রাজাগণ পটুয়াখালী বাখরগঞ্জ অঞ্চলে শাসন করলেও তাঁরা মোঘল বশ্যতা স্বীকার করতেন। বর্তমান পটুয়াখালী অঞ্চল প্রথমদিকেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ের কারণে সাবেক বাংলা প্রদেশের (বিহার ও উড়িষ্যাসহ) অন্যান্য অংশের ন্যায় বর্তমান পটুয়াখালী অঞ্চলও ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনাধীনে আসে। বিদেশী শাসনের প্রথম বাছরগুলোতে পটুয়াখালী বাখেরগঞ্জ এলাকা ঢাকা প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে ম্যাজিষ্ট্রেটের ক্ষমতাসহ একজন বেসামরিক বিচারক নিয়োগ করা হয়। তদানীন্তন বাখরগঞ্জ জেলার দক্ষিণাঞ্চলের বিরাট অংশ নিয়ে ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে পটুয়াখালী মহকুমা গঠন করা হয়।১৩ ‘১৭৬৪ সালে ফ্রা রাফেলডাস অ্যানজোস নামক এক পর্তুগীজ পাদ্রিকে বাকেরগঞ্জের ৫ মাইল দক্ষিণে একটি তালুক বন্দোবস্ত দেয়া হয়। পরবর্তীতে সেটি পাদ্রিশিবপুর নামে পরিচিত হয়। পোড্রো-গণ সালভেস নামে জনৈক পাদ্রি এখানে গির্জা নির্মাণ করেন বলে কথিত আছে। ধর্মযাজকদের অবিরাম প্রচেষ্টার ফলে এখানকার শিক্ষা ও জীবন যাত্রার মান অনেক উন্নত হয়েছে।’১৪ পটুয়াখালীর মধ্যবিত্ত সমাজের একটি অংশ পাদ্রিশিবপুর স্কুলের কারণে বিকাশিত হয়েছিল। ১৮২৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর স্থাপিত হয়েছিল বরিশাল ইংরেজি স্কুল। ১৮৫৩ সালে পরিণত হয় বরিশাল জেলা স্কুলে। মি. জন স্মিথ ছিলেন প্রতম প্রধান শিক্ষক। আধুনিক বরিশালের রূপকার অশ্বিনীকুমার দত্তকে কেন্দ্রকরেই এখানে নবজাগরণ হয়েছিল বললে অত্যুক্তি হয়না। ‘অশ্বিনীকুমার দত্ত, কালিশ চন্দ্র পন্ডিত ও জগদীশ আচার্য এই তিন মহাপুরুষকে বলা হত বরিশাল ত্রয়ী।’১৫ দক্ষিণাঞ্চলে মুসলমানদের আলোকিত হতে আরো সময় লেগেছিল। ১৮৭৪ সালে জেলার ৩৬৫ বিদ্যালয়ের হিন্দু ছাত্র সংখ্যা ৭৫০০ ও মুসলমান ৪৬০০। মুসলমানদের মধ্যে গরীবের সংখ্যাই বেশি। শহর বা বাজার এলকায় তাদের বসবাস ছিল কম। তাছাড়া মুসলমানদের মধ্যে গৃহশিক্ষা ও আরবিক শিক্ষায় আগ্রহ ছিল প্রবল। ১৮৮২ সালে সরকারি চাকরিতে বরিশাল অঞ্চলে ৩৮৯ জন হিন্দু ও মুসলমান মাত্র ৩৪ ছিলেন। উনবিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপের বাজারে হঠাৎকরেই পূর্ববঙ্গের পাটের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ফলে মুসলমান চাষীরা অর্থের মুখ দেখতে শুরু করে ও তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানো শুরু করে। কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলে পাট চাষ হয় না বলে এখানকার মুসলমানদের আলো দেখতে আরো অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

শিক্ষানুরাগী মুসলিম সমাজে দারিদ্রের কারণে জায়গীর প্রথা প্রচলিত ছিল। কলকাতায় নাগরিক জীবনে ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপের কারণে ছাত্র পোষণ প্রথা উঠে যায়। কিন্তু দক্ষিণ বঙ্গে জায়গীর প্রথা পুরোপুরি উঠে যায়নি। এ সমস্যা সমাধানে শতাব্দির শেষ দিকে আব্দুল লতিফের নেতৃত্বে ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠা আন্দোলন জোড়দার হয়। ১৮৮৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা কলেজের কতিপয় ছাত্রের উদ্যোগে ‘ঢাকা মুসলমান সুহৃদ সম্মিলনী’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটি অভিনব পদ্ধতিতে নারী শিক্ষা প্রসারে বিপুল অবদান রাখে। এ সংগঠনের অন্যতম সংগঠক উকিল হেমায়েত উদ্দিন আহমেদ (১৮৬০-১৯৪১) বরিশালে মুসলিম শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি ১৮৯৩ সালে বরিশালে আঞ্জমনে হেমায়েত ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। তার উদ্যোগে বরিশালে ১৮৯৫ সালে ‘বেল ইসলামিয়া হোস্টেল’ নির্মিত হয়। বরিশাল কেন্দ্র থেকে যেসব মুসলমান ছাত্র এন্ট্রাস পরীক্ষা দিত তিনি তাদের সন্ধ্যা পার্টিতে আমান্ত্রণ জানিয়ে উৎসাহিত করতেন।

বাংলায় শিক্ষিত মুসলিম সমাজের ভিক্তি তৈরী করেছে কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পটুয়াখালী জেলার মধ্যবিত্ত সমাজ বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে পটুয়াখালী জুবিলী স্কুল। ‘১৮৭১ সালে পটুয়াখালী মহাকুমার কাজ যথারীতি শুরু হলে শহরকে কেন্দ্র করে শুরু হয় নব জাগরণ। জাগরণের অগ্রদূত ছিলেন ঢাকা, বরিশাল ও ফরিদপুর থেকে আগত উকিল, মোক্তার, ব্যবসায়ী, মহাজন ও কতিপয় রাজ কর্মচরী। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বরিশাল সরকারী ব্রজমোহন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় অশ্বিনিকুমার দত্তের পিতা স্বর্গীয় ব্রজমোহন দত্ত (পটুয়াখালী মহাকুমার মেজিষ্ট্রেট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রথম মুন্সেফ), কংগ্রেস নেতা সতীন্দ্র নাথ সেনের পিতা নবীন চন্দ্র সেন, বিপ্লবী হীরালাল দাশ গুপ্তের পিতা উমেশ চন্দ্র দাশগুপ্ত, অক্ষয় কুমার দে প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ তাদের প্রচেষ্টায় ১৮৭৬ সালে বর্তমান জেলা ডাকঘরের কাছে অক্ষয় কুমার দের নিজস্ব জায়গায় একখানা গোলপাতার ঘরে রসরঞ্জন সেন নামক জনৈক অনারারী মেজিষ্ট্রেটের প্রধান শিক্ষকতায় ‘পটুয়াখালী এন্ট্রাস স্কুল’ নামে বিদ্যালয়ের প্রথম কাজ শুরু হয়।’১৬ জুবীলি স্কুলের শতবর্ষ পূর্তি উৎসব প্রকাশনায় এড. হাবিব উল্লাহ বিশ্বাস লিখেছেন জুবিলী স্কুল ভবনটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৭ সনে। এটিই ছিল তৎকালীন মহাকুমার প্রথম হাই স্কুল ও পাকা ভবন। বৃটিশ রাজত্বের রাজ্যেশ্বরী মহারাণী ভিক্টোরিয়ার সিংহাসনে আরোহণের স্বর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে অনুষ্ঠান শেষে সংগৃহিত যে টাকা উদ্বৃত্ত ছিল তার শেষ ফল বর্তমানের সু প্রসিদ্ধ বিদ্যাপীঠ সরকারী জুবিলী হাই স্কুল।

পটুয়াখালী জুবিলী হাই ইংলিশ স্কুল নামে এটি ১৮৮৭ সালে যাত্রা শুরু করার পরই স্কুলটি ফলাফলে অসাধারণ সাফল্য দেখায়। ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী অনুমোদন লাভ করে। পন্ডিতকুল শিরোমনি বরদাকান্ত সেন, নবচন্দ্র ব্যানার্জি, জহুরুল হক, আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরি, ইমরান আলী, আব্দুল আউয়াল খন্দকার, মু এমদাদ আলীর মত বিদ্বান ব্যক্তিবর্গ এখানে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা প্রায় সকলেই নিজ সময়ে কিংবদন্তিসম ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। তারা ছিলেন জেলার সবচেয়ে সম্মানিত ও সার্বজনীনভাবে শ্রদ্ধেয়। প্রতিযুগে এই স্কুল এমন কিছু শিক্ষক পেয়েছে যাদের মাত্র একজনের পরশেই কৃষকের ছেলে হয়ে উঠতে পেরেছিল সমাজের যোগ্যতর নাগরিক। এই পশ্চাদপদ দক্ষিণের জনপদে জুবিলী স্কুল ছিল আক্ষরিক অর্থেই মধ্যবিত্তের বাতিঘর যে পথ দেখিয়েছিল নিরন্তর সংগ্রামরত কুলহারা এক কৃষিজীবি প্রান্তিক জনগোষ্ঠিকে।

তথ্যপঞ্জিঃ১. সৈয়দ আবুল মকসুদ, প্রথম আলো ২৩/০৮/২০১২২. ২৩/৯/২০১১ নিউইয়র্ক থেকে এএফপি৩. ঞযব ঝঃড়ৎু ড়ভ ঊধৎষু ওহফরধহ ঈরারষরুধঃরড়হ নু এবৎঃৎঁফব ঊসবৎংড়হ ঝবহ. ৪. আমার দেশ- ১৪ এপ্রিল ২০১২ বাংলার সংস্কৃতিতে বৌদ্ধ প্রভাব, প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া৫.এ কে এম শাহনাওয়াজ; বাংলার সংস্কৃতি বাংলার সভ্যতা৬. উনিশ শতকের বাংলা সমালোচনা সাহিত্য- সলিমুল্ল­াহ খান৭. প্রফেসর ইমেরিটাস আবদুর করিম৮. আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও মুসলিম সমাজ-কাজী আব্দুল মান্নান৯. ড. এ আর মল্লিক১০. আধুনিক ভারত- প্রণব কুমার চট্রোপাধ্যায়১১. উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের চিন্তা ও চেতনার ধারা-ওয়াকিল আহমেদ১২. বাংলাদেশ : এর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য- এমাজউদ্দিন আহমেদ, কালের কণ্ঠ ০৩/১০/১২১৩. পটুয়াখালী জেলা তথ্য বাতায়ন১৪. বাকেরগঞ্জ জেলা গেজেটিয়ার ১৯৮৪।১৫. বাকেরগঞ্জের ইতিহাস- খোসাল চন্দ্র রায়১৬. বিদ্যালয় প্রসঙ্গে-নার্গিস আরা হক (জুবীলি স্কুলের শতবর্ষ পূর্তি উৎসব প্রকাশনা)