কারা যেন ভালোবেসে আলো জ্বেলেছিল

0
1352

মধ্য মার্চের দ্বিতীয় প্রহর। কিছু প্রতিবন্ধী মানুষ একত্রিত হচ্ছে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। কেউ আসছে হুইল চেয়ার নিয়ে, কেউ সাদা ছরি নিয়ে, কেউ অন্যের কাঁধে হাত রেখে, ইশারাভাষীরা এসেছে দল বেঁধে। এই বাক-শ্রবণ-দৃষ্টি-শারীরিক বা মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতা নিয়ে যারা এসেছে এখানে সবার হাতে একটি করে মোমবাতি, কারো বা হাতে সাদা ফুল। সংখ্যায় তারা শতাধিক নয়, হয়তো সহস্রাধিক। এই মানুষগুলো যদি স্বপ্নেও কোনোদিন তাদের প্রতিবন্ধিতা অতিক্রম করতে পারে তবে আমি নিশ্চিত মাতা-পিতা-প্রেয়সীর পর- একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী দৌড়ে এসে যাকে প্রথমবার পরম নির্ভরতায় আলিঙ্গন করবে; একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী প্রথম দুচোখ দিয়ে প্রাণভরে দেখবে যাকে, একজন বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী প্রথম চিৎকারে তার উদ্দেশ্যেই বলে উঠবে:

“রিমু ভাই, আমরা করবো জয় একদিন…”।

শত শত প্রতিবন্ধী মানুষ বুকভরা কষ্ট আর কান্না নিয়ে আলো জ্বেলেছিল সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়; তাদের আশা-আকাক্সক্ষা ও ভালোবাসার শেষ ভরসা রিমুভাই, তার স্ত্রী বিপাশা আর একমাত্র আত্মজ ৭ বছরের অনুরুদ্ধের প্রতি সম্মিলিত শোক ও শ্রদ্ধা জানাতে-যারা হারিয়ে গেছে ১২ মার্চের মধ্যবেলায়, হিমালয়ের দেশে। জীবনে শোকসভা করেছি বা দেখেছি অনেক, কিন্তু হাজার হাজার মানুষ মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিশে বুকে গভীর ক্ষত নিয়ে হৃদয়ে নিংড়ানো ভালোবাসা দিয়ে যে উজ্জ্বলতর আলো জ্বেলেছিল তেমন আলো আর দেখিনি কখনও। আমরা সৌভাগ্যবান এমন একজন দ্যুতিময় মানুষের বন্ধু ছিলাম।

সময়টা ১৯৮৯। মাত্র এসএসসি পাস করে আমরা ভর্তি হয়েছি ঢাকা কলেজে। শৈশবের চৌহদ্দি পেরিয়ে, অনুশাসনের ঘেরাটোপ এড়িয়ে, সীমাহীন স্বাধীনতা আর অজানা স্বপ্নে বিভোর কৈশোরকালের প্রারম্ভিক কোনো প্রহরে আমরা বন্ধু হয়েছিলাম কলেজের বারান্দায়। তারপর এতগুলো বছর পেরিয়ে আজ মধ্য জীবনে এসে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সংসারে থিতু আমরা। প্রতিষ্ঠিত পেশাগত জীবনে নিরোপদ্রব ও নিরাপদ পথচলায় আত্মমগ্ন সবাই। রিমুর প্রায় সকল বন্ধুই প্রথাগত ভাবনায় প্রতিষ্ঠিত। সামরিক-বেসামরিক আমলা, শিক্ষক, সাংবাদিক, ডা., ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার, ব্যারিস্টার, সেভেন ডিজিট মাইনের গ্লোবাল কর্পোরেট কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী……সবারই ব্যক্তি জীবনে শক্ত প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নের সীমানাও নির্ধারিত হয়ে যায় শক্তভাবে। এরই মাঝে দু’একজন থাকে যারা আজও কৈশোরের স্পর্ধিত সময়ের মতো স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখায়। রিমু সেই হতে গোনা বিরল স্বপ্নদর্শীর একজন।

অভিন্ন স্বপ্নে আমরা ছাত্র রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে জড়িয়ে ছিলাম। বাংলাদেশের রাজনীতির সেই দুঃসময়ে আমরা সহপাঠীদের মধ্যে রাষ্ট্রিয়ভাবে উচ্চারণ নিষিদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও জয়বাংলার কথা বলে যেতাম। ছাত্রলীগের মিছিল কীভাবে আরও দীর্ঘ করা যায় সে ভাবনা ও কর্মেই কেটেছে কলেজের প্রাথমিক দিনগুলো। আমরা তখন কমবেশি জানতাম দেড় শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজের গৌরবগাঁথা। অগণিত কালজয়ী বাঙালির যোগ্য উত্তরাধিকার হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার দুর্বার প্রচেষ্টা ছিল আমাদের। সেমতে আমরা আব্দুল্লাহ্ আবু সাইয়ীদ স্যারের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রেই পার করেছি সোনালি বিকেলগুলো। ঐতিহাসিক ইয়ং বেঙ্গল গ্রুপের মতো রাস্তায় মানুষ ধরে যৌক্তিক জ্ঞান বিতরণের বালখিল্যতায় মেতেছিলাম আমরা।

আমাদের সবচেয়ে দুঃসাহসিক দিন কেটেছে ৯০’র আন্দোলনের সময়। ৮১ শুক্রাবাদ, মানে রিমুদের বাসা ছিল আমাদের নিজেদের বাড়ি। ব্যাকাপ হিসেবে জয় ও মোহনদের বাসাতো পাশাপাশি ছিলই। এ বাড়িতেই সকল আড্ডা, থাকা-খাওয়া-ঘুম, দিন বদলের নানা স্বপ্ন, পরের দিনের পিকেটিং প্ল্যান। ছাত্রলীগের অসংখ্য কেন্দ্রীয় নেতা মাথায় হুলিয়া নিয়ে ফেরারি জীবনের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দিনের পর দিন কাটিয়েছে এ বাড়িতেই। রিমুর বাবা জহিরুল হক একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী, পাড়ার সবাই হাজী সাব বলেই চিনে। স্থানীয় মসজিদের সভাপতি ছিলেন। অবসরের টাকা দিয়ে গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীতে এতিমখানা, মসজিদ-মাদ্রাসা করেছেন। খুবই ধার্মিক ও পরহেজগার মানুষ। রিমুর মাও তাই। আদর্শ গৃহিণী হিসেবে সংসার ধর্মের সাথে সাথে ইবাদত বন্দেগিতেই কেটে যাচ্ছে তার জীবন। এরকম একটি বর্ধিষ্ণু মুসলিম বাড়িতে ছেলের বন্ধুদের ২৪ ঘণ্টা অত্যাচার অন্যকোনো পরিবারের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করি না। এর একটা বড় কারণ অবশ্য রিমুর ভাই-বোনদের আকুণ্ঠ সমর্থন। রাজুভাই, ঝুমু আপা বা রিতু সবাই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দারুণ প্রাগ্রসর মানসিকতার, তাই হয়তো এতটা প্রশ্রয় আমাদের। ৮১ শুক্রাবাদ, এই বাড়িটি না থাকলে আমাদের তারুণ্য গঠন হয়তো অন্যরকম হতো, জীবনে অনেক কিছু যে মিস করতাম শুধু তাই নয়, আমাদের বর্তমান যাপিত জীবনটাই হয়তো বদলে যেত অনেকটাই। ও বাড়িটি আমাদের এতটাই নিজস্ব যে বিগত প্রায় ৩০ বছর জীবনে কোনো পারিবারিক ইভেন্ট আমাদের বাদে হয়নি। ব্যক্তিগত সম্পর্ক অতিক্রম করে পারিবারিক প্রতিটি উৎসব বা দুঃখগাথায় আমরা ছিলাম পারস্পরিক নির্ভরতা। এর আগে এখানে ৩ বার মৃত্যু হানা দিয়েছে। রিমুর দাদা, বাবা ও রিমুর প্রথম সন্তান। এ বাড়ির প্রতিটা শোক আমাদের রিমুর মতো হয়তো স্পর্শ করে না কেননা তা সম্ভব নয় বলে, তবে আমাদের হৃদয়ও ক্ষতবিক্ষত হয়েছে অবিশ্বাস্যভাবে। এ বাড়িটি শুধু বন্ধুতার আঁতুড়ঘর নয়, এটি আমাদের কাছে মন্দিরের ন্যায় পবিত্র; বটগাছের মতো ছায়া দিয়েছে, বাতিঘরের মতো পথ দেখিয়েছে দুঃসময়ে। শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় এটি টিনশেড ছিল, ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বিশ্বস্ত আশ্রয়, কখনও কখনও নিরাপদ অস্ত্রাগার।

৯০’র আন্দোলনের চরম উন্মত্ততা ও উদ্দমতার পরও আমরা ইন্টারমিডিয়েটে প্রায় সবাই কাক্সিক্ষত সাফল্যে উত্তীর্ণ হই। পরীক্ষার পরপরই আমরা জড়িয়ে পরলাম জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণআদালত আন্দোলনে। ৯১’র জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হয়েও ৯০ এর সফলতায় আমরা আরও উদ্দীপ্ত হই দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধে। ৯২’র ২৬ মার্চ গণ-আদালতের রায়ের সময় আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানের গন্ধ পেলাম। এরই মাঝে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই ১৯৯১-৯২ সেশনে। রিমু ভর্তি হলো ম্যানেজমেন্টে। ক্যাম্পাসটা আমাদের যেন চিরচেনা। সেই ইন্টার লাইফ থেকে আমরা মিছিল নিয়ে নিয়মিত মধুতে আসি। বইমেলা বা কবিতা পরিষদ সূত্রে দেশ বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে আমাদের তুমুল ভাব কলেজ জীবন থেকেই, নিয়মিত আড্ডা দেই টিএসসিতে। ছাত্র রাজনীতি বা সাংস্কৃতিক অঙ্গন সব জায়গাতেই ঢাকা কলেজের সাবেকদের একক প্রাধান্য, তাই সব সেক্টরের দরজাই উন্মুক্ত আমাদের জন্য।

আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন হলো। কেন্দ্রে মাঈনু-ইকবাল, বিশ্ববিদ্যালয়ে লিজু-পঙ্কজ। আমাদের ব্যাচটা ছাত্রলীগের ইতিহাসে দুর্দান্ত একটি অনন্য ব্যাচ। একসঙ্গে এত পরিমাণ লড়াকু সহযোদ্ধা আগে পরে কোনো ব্যাচে ছিল বলে মনে হয় না। অথচ আমরাই সবচেয়ে দুর্ভাগা কেননা বাহাদুর-খোকনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটিই করতে পারেনি, আর আগ্রবর্তী লিজু-পঙ্কজের পূর্ণাঙ্গ কমিটি আমাদের ভর্তি হবার আগেই ঘোষণা হয়ে গেছে। এরমাঝে একমাত্র সৌভাগ্যবান রফিক জামান রিমু। হল কমিটি গঠনে অরাজকতা তৈরি হলেও ফার্স্ট ইয়ারেই জিয়া হলের সেক্রেটারি নির্বাচিত হয় রিমু। বাংলা শতবর্ষ উপলক্ষে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাংলা কবিতার সংকলন রৌদ করোটি সম্পাদনা করে আখলাক, রিমু, শহিদ, মিল্টনসহ আমাদের কয়েকজন বন্ধু ১৯৯৩ সালে। পরবর্তীতে এই সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ থেকেই জন্ম নিল একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘রৌদ করোটি’।

১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের সাধারণ ছাত্ররা একটি অভাবনীয় আন্দোলন শুরু করলো, পূর্ণাঙ্গ কমার্স ফ্যাকাল্টি নির্মাণের দাবিতে। আজকে যে সুবিশাল বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের আধুনিক ভবন নির্মিত হয়েছে এমন ছিল না সেসময়। তখন শুধু নিপা ভবনে বাণিজ্য অনুষদের সকল বিভাগের ক্লাস হতো। আমরা যারা সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ছাত্র তাদেরও সাবসিডারি ক্লাস হতো এখানে। ক্লাস রুমের স্বল্পতায় তখন টুকটাক অরাজকতা লেগেই থাকতো। সেই সময় কিবরিয়া মজুমদারের নেতৃত্বে কমার্স ফ্যাকাল্টি আন্দোলন বেগবান ও সফল আন্দোলন হয়ে ওঠে। এই আন্দোলনের সূচনাতে রিমু ছিল অগ্রবর্তী ভূমিকায়। আন্দোলনের সফলতা হিসেবে ৬ জুলাই ১৯৯৫ তারিখ থেকে বাণিজ্য অনুষদের নাম পরিবর্তন করে বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ করা হয় ও পরবর্তীতে সুপরিসর অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয়।

এই টিএসসি সেদিন এমন ছিল না। হাতে গোনা কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ছাড়া গোটা নিয়ন্ত্রণ ছিল শিবিরমনা ছাত্রদলের গুটি কয়েকের হাতে। ৯৬’র আন্দোলনের আগেই আমরা টিএসসি দালালমুক্ত করি। শুরুটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে। রিমুর সাহসী নেতৃত্বে একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ শুরু হলো। বড় পর্দায় বিশ্ববিখ্যাত সিনেমা প্রদর্শন জনপ্রিয় হয় সাইন্স ফিকশন ফিল্ম ফেস্টিবলের মাধ্যমে। তারপর একে একে ওয়ার ফিল্ম, কমেডি ফিল্ম, অস্কার ফিল্ম, এনিমেশন ফিল্ম…. প্রতিবছর থিমেটিক চলচ্চিত্র উৎসবের ধারা প্রচলন হয়। পরবর্তীতে মামুন ভাই, বিপ্লব মোস্তাফিজ, সাব্বির, রিমুসহ আমাদের ৫ জনকে আজীবন সদস্যপদ প্রদান করে।

ততদিনে আমরা ছাত্র রাজনীতিতে ফুল টাইমার হলেও রিমু প্রথাগত রাজনৈতিক ধারার বাইরে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় বেশি মনোনিবেশ করলো। আমরা লিজু-পঙ্কজের নেতৃত্বে তখন প্রথমবারের মতো বিভিন্ন বিভাগে ছাত্রলীগের কমিটি গঠন শুরু করলাম আর রিমু তখন ব্যস্ত ছাত্রলীগের পাঠচক্র নিয়ে। ছাত্রলীগের পাঠচক্র শুরু হলো আমরা কজন মুজিব সেনার ব্যানারে, প্রধান উদ্যোক্তা রিমু। তখন আমরা কামাল পাশা-পরাগ ভাইর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র কমান্ডে জড়িয়েছি কিন্তু রিমু এখানে ছিল আমাদের চেয়েও এক্টিভ। বিশেষতঃ একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ঢাকা মহানগর পর্যায়ের অন্যতম মেধাবী সংগঠক ছিল রিমু। ৯৬’র জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভের পরপরই প্রথমবার শিশু একাডেমি চত্বরে মুক্তিযুদ্ধ মেলার আয়োজন করে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। রিমু ছিল তার অন্যতম সংগঠক।

শহিদসহ অন্য বন্ধুদের দুষ্টামিতে রফিক জামান রিমু তখন আস্তে আস্তে সবার কাছে বস হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠল। বস তার ছাদের চিলেকোঠায় একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করলেন। বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি বসের প্রিয় বিষয়। এই সময়টাতে শেখসাব বাজারে মালেকদের বাড়িতে নিয়মিত আড্ডা চললো টানা কয়েক বছর। অর্থনৈতিক কন্ট্রিবিউটর হিসেবে বস নিয়মিত লিখতে থাকেন বিভিন্ন মিডিয়ায়। মতামত ডট কম নামক বিডিকমের একটি ওয়েব পোর্টাল নির্মাণ করে হাসান সাবির সুজন, বিপ্লব মোস্তাফিজ প্রমুখের সঙ্গে। ২০০১’র নির্বাচনে লাইভ স্ট্রিমিংএ মতামত ডট কম যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে।

২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরে যাওয়ার পর শেখ হাসিনা একটি গবেষণা সেল গঠনের উদ্যোগ নেন। মাহাবুবুল হক শাকিল ভাইর নেতৃত্বে সেন্টার ফর রিসার্স অ্যান্ড ইনফরমেশন বা সিআরআই নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ধানমন্ডি ৪ নম্বরে যাত্রা শুরু করল। বস ওখানে ফুল টাইমার। দেশি-বিদেশি পুরনো পত্র-পত্রিকা ঘেঁটে বিভিন্ন প্রকারের রাজনীতি ও উন্নয়নমূলক ডাটা বেইজ তৈরি করা তার কাজ। সিআরআই তখন যতগুলো গবেষণামূলক প্রকাশনা বের করেছে বস ছিলেন প্রতিটির নেপথ্য ভূমিকায়।

সিআরআই’র প্রথম বড় সার্থক আয়োজন ২০০২ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে ২ দিনব্যাপী ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক কনভেনশন। বিচারপতি কে এম সোবহান ছিলেন কনভেনার, ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম সম্ভবত জয়েন্ট কনভেনার। এ উপলক্ষে “ক্রাইম এগেইনস্ট হিউম্যানিটি” শিরোনামে ওয়াহিদুল হকের সম্পাদনায় একটি ফটো অ্যালবামসহ বেশকিছু প্রকাশনা বের হয়। এই আয়োজনের অন্যতম নেপথ্য কারিগর আমাদের বস। এই কনভেনশনের পরপরই ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার বড় রকমের ধাক্কা খায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অন্যতম কালো অধ্যায় ২০০২ সালের ২৩ জুলাই শামসুন্নাহার হলের ছাত্রী নির্যাতন। সেই কালো রাতে ১২টার দিকে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে হল প্রাধ্যক্ষকে সরানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের গেট ভেঙে সাধারণ ছাত্রীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় তৎকালীন সরকারের পুলিশ বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা। শতাধিক নিরপরাধ ছাত্রীদের আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সে ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই ২৪ জুলাই বস একটা পোস্টার ডিজাইন আমাকে মেইল করে। পোস্টার ছেপে সে রাতেই আমরা ঢেকে ফেলি গোটা ক্যাম্পাস। স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা সে আন্দোলনে উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই আন্দোলন সংঘটনে বস ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়, যে ইতিহাস কখনও বলা হয় না। বস ক্যাম্পাসের প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে এভাবেই ছিলেন নিউক্লিয়াসের ভূমিকায় কিন্তু সবসময়ই প্রচারের বাইরে।

২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনীর দ্বারা ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ এর নামে বিরোধী নির্যাতনে মেতে ওঠে ক্ষমতাসীনরা। ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত চলে এই অভিযান। এতটাই নির্মম ছিল এই অভিযান যে তার বৈধতা দিতে ২০০৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে ‘যৌথ বাহিনীর অভিযান দায়মুক্তি আইন’ নামে একটি আইন করতে হয়েছিল।

আমি তখন ক্ষুদ্রাকারে মুদ্রণ ব্যবসায় যুক্ত। ২০০১ সালের নির্বাচন নিয়ে আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সম্পাদনায় সিআরআই কর্তৃক প্রকাশিতব্য ‘কারচুপির নির্বাচন, অবৈধ সরকার’ শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থ ছাপার সময় পুলিশ বিভিন্ন ছাপাখানায় রেড দেয়া শুরু করলো। বস একদিন হন্তদন্ত হয়ে আমার কাছে ছুটে আসলো একগাড়ি ছাপা ফর্মা নিয়ে। আমার ছাপাখানা ছিল কেএমদাস লেনের ঠাকুর বাড়ির এক ঘুপচিতে। সারারাত জেগে কাভার ছাপিয়ে অতি গোপনে বাঁধাই করেছি। বইটি ছাপার কয়েকদিন পরে, অপারেশন ক্লিন হার্টের প্রারম্ভিক সময়ে ২০০২ এর ২১ অক্টোবর রাতে সিআরআই’র প্রধান পৃষ্ঠপোষক সাবের চৌ. গ্রেফতার হন। খবর শোনা মাত্রই ধানমন্ডি ৪ এর ৫ তলায় অবস্থিত সিআরআই’র অফিস খালি করা শুরু হয়। সারারাত ধরে সব ডকুমেন্ট ও পাবলিকেশন নিরাপদে সরিয়ে রাখা হয় বিভিন্ন বাসায়। অফিস সহকারী রানা ও শাহিন ছাড়া শুধু বস ও বসের সহযোদ্ধা মাহফুজ মাসুম ছিল, আর কেউই থাকতে সাহস করেনি সে রাতে। কম্পিউটার থেকে সকল হার্ড ডিস্ক খুলে বস নিজের জিম্মায় বাসায় নিয়ে গেলেন। অরক্ষিত অফিসে মাসুম একা বলে বস পরদিন সকালে আবার চলে এলেন অফিসে। সব কিছুই ঠিকঠাক হঠাৎই ৫ তলা থেকে নিচে তাকিয়ে দেখা গেল বাড়িটি ঘিরে ফেলেছে সেনাবাহিনী। বসরা লুকিয়ে পড়লো চারতলার বিইউপি অফিসে। যৌথবাহিনী গোটা বিল্ডিং এর সবাইকে ধরে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করে শুধু অফিস সহকারী রানাকে গ্রেপ্তার করে সিআরআই অফিসে তালা ঝুলিয়ে দিল। সবাই এমনকি নেত্রীও জানলেন রিমু-মাসুমসহ সবাই গ্রেপ্তার। সেদিন বসদের অসীম সাহস আর বুদ্ধিমত্তায় রক্ষা পেল সিআরআই’র সকল গবেষণা ও গোপনীয় সব দলিল দস্তাবেজ। এরপর ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে কয়েক বছর চোর পুলিশ খেলতে খেলতে ধানমন্ডি ৫ নম্বরের সুধা সদনে জায়গা মেলে সিআরআই।

সিআরআই ছেড়ে বস যোগ দিলেন সাংবাদিকতায়। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে অর্থনীতি নিয়ে লেখালেখি। ২০০৪ সালে অর্থনৈতিক রিপোর্টার হিসেবে যোগ দিলেন সদ্যপ্রতিষ্ঠিত দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকায়। পরে বিডি নিউজ ২৪ এ। ২০০৬ সালে বস তার চিলেকোঠার লাইব্রেরিতে বিসিআরডি (বাংলাদেশ সেন্টার ফর রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) নামক একটি সংগঠন গঠন করলেন। আমরা সবাই তাতে উৎসাহ দিলাম। কেননা বস তখন অধিকার বঞ্চিত মানুষের ক্ষমতায়নে দিন রাত পড়াশুনা আর নানা পরিকল্পনায় কাটিয়েছে একটি বছর। এরপর ২০০৭ সালে কাজ শুরু করলো জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম বা এনএফওডব্লিওডি-তে ফয়সালের সঙ্গে। এখান থেকেই শুরু হলো বসের অন্যজীবন, প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ভিন্নতর কল্যাণ ভাবনা।

২০০৮ সালে প্রতিবন্ধী মানুষকে সংগঠিত করে গড়ে তোলেন সোসাইটি অব দ্য ডেফ অ্যান্ড সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইউজার্স (এসডিএসএল)। প্রতিষ্ঠাতাকালীন সময় থেকে আমৃত্যু কোষাধ্যক্ষ ছিলেন তিনি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল ক্ষমতায় আসলে বস প্রথম ক্যাম্পেইন শুরু করে ইশারা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য, রাষ্ট্রকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধীরা কেবল ভাষাগত যোগাযোগ প্রতিবন্ধকতার কারণেই অধিকার বঞ্চিত। ২০০৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বসের প্রচেষ্টায় বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো বাংলা ইশারা দোভাষী ব্যবহার করা হয়। ইতোমধ্যেই শুরু করেছে ইশারা ভাষা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দোভাষী তৈরির কাজ।

এডিএসএল ২০১০ সাল থেকে ৭ ফেব্রুয়ারিকে ‘বাংলা ইশারা ভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করার প্রচলন শুরু করলো। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ২৬ জানুয়ারি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি সরকারি দিবস হিসেবে ৭ ফেব্রুয়ারিকে বাংলা ইশারা ভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিবছর তা উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। নির্যাতিত শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় থানাসহ জেলা আদালতে জবানবন্দি নেয়ার জন্য বাংলা ইশারা ভাষায় প্রশিক্ষিত দোভাষীদের সহায়তা রাখার উদ্যোগ নেন বস। বাংলা ইশারা ভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা ও ইশারা ভাষা আইন প্রণয়ন নিয়েও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করেছেন অনেক।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদে শমি-সানাদের পরে সবচেয়ে সাংগঠনিক ব্যাচ ছিল ৯৭-৯৮ এর রোদ-রাসেল-বিপাশা-টয়দের ব্যাচ। রোদেলা নিরুপমা ইসলামকে রোদ আর সানজিদা হক বিপাশাকে ডাকি বিপাশ বলে। রোদ-বিপাশা দুজনেই ভর্তি হয়েছে আমার ডিপার্টমেন্ট লোক প্রশাসনে। তাই খাতিরটা জমেছিল দ্রুতই। খুবই উচ্ছল আর প্রাণবন্ত একটা গ্রুপ, দারুণ উদ্দমতায় কেটেছিল সেই দিনগুলো। চলচ্চিত্র সংসদের দায়িত্ব ওরা নেয়ার পরে আমরা অনেকটাই ভারমুক্ত হই। বিপাশ যখন থার্ড ইয়ারে তখনই রিমু প্রেমে পরে বিপাশের। বিপাশ যশোরের মেয়ে, বুদ্ধিদীপ্ত, মায়াবী চেহারা, খুবই প্রাণোচ্ছল অথচ অন্তর্মুখী স্বভাবের। ডিইউএফএস’র অনেক অনুষ্ঠান ও সঞ্চালনা করেছে কিন্তু কখনই ওকে সাজতে দেখিনি। শুধু বিশাল একটি লাল টিপ পড়ত কপালজুড়ে, ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণীর মতো। ২০০৫ সালে ওদের বিয়ে হয়। বিপাশ বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে জয়েন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজনে। কর্মজীবনে বিপাশ খুব অল্প সময়েই মন কেড়ে নেয় সকল সহকর্মীর।

বিপাশের অকাল মৃত্যুতে ওর পরিবারের ৩ জনের জন্য আলাদাভাবে শোক প্রকাশ করেছে ইউ এস এ্যাম্বাসি। গত বছর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঠরংরঃড়ৎ খবধফবৎংযরঢ় চৎড়মৎধস ড়হ ঃযব ৎড়ষব ড়ভ পরারষ ংড়পরবঃু রহ ঃযব বষবপঃড়ৎধষ ঢ়ৎড়পবংং প্রোগ্রামে বিপাশের সগৌরব উপস্থিতিতে ওরা মুগ্ধ হয়েছিল বলে শোকবার্তায় জানিয়েছে। বিপাশ পরে জয়েন করেছিল হাঙ্গার প্রজেক্টে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ চলমান সময়ের একটি অনুকরণীয় গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক সংগঠন। গণতান্ত্রিক বলছি এই কারণে পুনর্গঠিত হওয়ার পর থেকে প্রায় দুই যুগ ধরে প্রতিবছর নিয়মতান্ত্রিকভাবে বা গঠনতান্ত্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের রানিং স্টুডেন্ট থেকে নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়, একবারের জন্যও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে ব্যত্যয় ঘটেনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নানা প্রকারের কর্মসূচি বা ইভেন্ট আয়োজনের জন্য চলচ্চিত্র সংসদ উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম নয় বিধায় বর্তমান ছাত্র ও সাবেকদের নিয়ে গঠন করলো ‘স্লোগান ৭১’ নামের একটি অসাধারণ সংগঠন ২০০৯ সালে।

যার নেতৃত্বে থাকবে বর্তমান ছাত্ররা, সাবেকরা থাকবে তাদের পাশে। মূলত সাবেক ছাত্রলীগ ও সাবেক চলচ্চিত্র সংসদের কর্মীরাই এর প্রাণ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিবছর বিজয় দিবসের প্রাক্কালে স্লোগান ৭১’র নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ ৩ দিনব্যাপী উদযাপন করে ‘রক্তে রাঙা বিজয় আমার’ শীর্ষক একটি অনবদ্য অনুষ্ঠান। ১৫ ডিসেম্বর রাতে ফানুস ও রাত ১২টায় শুরু হয় তুমুল আতশবাজি। প্রতিবছর সাবেকরা সবাই সপরিবারে মিলিত হয় বিজয়ের রাতের আলোর উৎসবে। এটি এখন একটি সিগনেচার প্রোগ্রাম যা ছিল বসেরই ব্রেন চাইল্ড।

৭১ পরবর্তী বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়া সবচেয়ে গৌরবময় আন্দোলন শুরু হয় ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে যা ঐতিহাসিক গণজাগরণ মঞ্চ আন্দোলন নামে পরিচিত। ৫ ফেব্রুয়ারি রাজাকার কাদের মোল্লার রায়ের প্রতিবাদ জানিয়ে ক্যাম্পাসে স্লোগান ’৭১ এর প্রতিবাদী মিছিলটিই ছিল সারাদেশের মধ্যেই প্রথম সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ। অনলাইন এক্টিভিস্ট, স্লোগান ’৭১, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ প্রমুখ সংগঠনের অগ্রবর্তি ভূমিকায় গণজাগরণ মঞ্চ আন্দোলনে যোগ দেয় দল মত নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ তরুণ তরুণী। শাহবাগ ঘুমায় না, অষ্টপ্রহর জেগে থাকে রিমুরা । আমি তখন ‘মুক্তযুদ্ধ’ নামক একটি দৈনিক বুলেটিন প্রতিদিন প্রকাশ করি যার উদ্যোগ নিয়েছিলাম রিমুর সাহসে।

এর পরই বস আবার মনোযোগী হয় তার পেশাদার কাজে। জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম হলো বিভিন্ন দেশি-বিদেশি এনজিও যারা প্রতিবন্ধিতা নিয়ে কাজ করে তাদের একটি সমন্বয়ক সংগঠন। বস এই ধারাটি শর্তহীন করতে চাইলেন। অধিকারবঞ্চিত মানুষগুলোর জন্য কোনোপ্রকার এনজিও নির্ভরতা বা সাহায্য ছাড়া শুধু প্রতিবন্ধী সংগঠনগুলো নিয়ে কীভাবে নিঃশর্তভাবে এগিয়ে চলা যায় সেই পরিকল্পনায় ২০১৪ সালে আদাবরে নিজ পৈতৃক জমিতে গঠন করলো পিএনএসপি বা প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ। এরপর থেকে একক প্রচেষ্টায় এগিয়ে চলা। ইতোমধ্যেই সরকারিভাবে পাঠ্যপুস্তকের ব্রেইল ভার্সন চালু হয়েছে বসের প্রচেষ্টায়। বসের আরও অনেক স্বপ্ন ছিল প্রতিবন্ধীদের নিয়ে, কত কাজ বাকি ছিল তার! ১৫ মার্চ তাই শত শত প্রতিবন্ধী মানুষ একত্রিত হয়েছিল স্বপ্নভঙ্গের ব্যথা নিয়ে দূর পাহাড়ে সপরিবারে হারিয়ে যাওয়া কোনো একজনকে শোক জানাতে, যে তাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিল।

সদা চঞ্চল ছোট্ট শিশু অনুরুদ্ধ, কতই বা বয়স, ৭ও পেরোয়নি। আমার প্রথম সন্তান মন এর বন্ধু। ওরা প্রায় সমবয়সী। অনিরুদ্ধকে পেটে নিয়ে বিপাশ আর রিমু এসেছিল মনকে দেখতে। মনের কয়েক মাস পরেই পৃথিবীতে এসেছিল অনিরুদ্ধ। প্রতিবছর ১৫ ডিসেম্বর রক্তে রাঙা বিজয় আমার অনুষ্ঠানে মধ্যরাত অবধি ওরা ফানুস উড়াতো টিএসসি চত্বরে। শুধুই জামান পরিবারেরই নয়, অনিরুদ্ধ আমাদের সকলেরই বড় আদরের সন্তান। ২০১৪ সালে স্বামী হারিয়ে ওর দাদি একমাত্র অন্ধের যষ্টি হিসেবে নাতিকে অবলম্বন করেই দিন কাটাতো বৃদ্ধ বয়সে। দাদির কাছেই শিখেছে শৈশবের সব প্রথম পাঠ। অরণি স্কুলে শেষ করেছে প্রাক প্রাথমিক, ছায়ানটের শিকড়ে বেড়ে ওঠা। সেই সঙ্গে দাদির কাছে ইতোমধ্যেই শিখে ফেলেছে ইসলামের এবিসিডি। নিজে নিজে নামাজ পড়তে পারতো নির্ভুল ভাবে। শিখেছে কোরআন পড়া। দাদি বলে কুলহু আল্লাহ দিয়ে নামাজ পড়া সহজ, অনিরুদ্ধ বলে ওঠে দাদি ‘তুমি কিচ্ছু জান না ওটা কুলহু আল্লাহ সুরা না, ওটা সুরা এখলাস’। নিজের সন্তানরা ধর্মীয় শিক্ষায় যথেষ্ট অনুরক্ত নয় বলে বিরাট আফসোস ছিল বৃদ্ধার। বৃদ্ধ বয়সে তাই নাতিকেই নিজের ছাত্র হিসেবে জান-প্রাণ শপে শিখাতে ছিল ইহকাল আর পরকালের প্রয়োজনীয় পাঠ। এখন আর তিনি কাকে শিখাবেন?
দু-চোখ ভরা তার শুধুই শূন্যতা।

যেদিন সব কিছু ভেঙে পড়ে, সেই ভয়াল ১২ মার্চ পাগল প্রায় সবাই। ঝুমুর আপা, রিতু, মঞ্জু ভাই, অর্ক, অনেক নিকটাত্মীয় আর বন্ধু স্বজন। বাড়ির চারতলায় ঝুমু আপার বাসায় আমরা। এত শোকের মাঝেও সবাই সচেতন ৩ তলায় যেখানে মাকে নিয়ে রিমু থাকতো সেখানে যেন কোনো খবর না পৌঁছায়। রিমুর বৃদ্ধ মা এই শোক সইতে পারবে না। পরের দিন আমাদের চিরকুমারী দোস্ত, ডা. মেখলা রিমুর সব ভাই-বোনদের সঙ্গে নিয়ে পেশাদার সাইক্রাইটিক হিসেবে খালাম্মাকে জানালেন নির্মম সেই চিরসত্যটা। মায়ের মনটা তখন কেমন করেছিল শুধু বিধাতাই জানে। ১৩ তারিখ শহীদ মিনার আর টিএসসিতে আলো জ্বালিয়ে বসকে স্মরণ করলো ক্যাম্পাসের সংগঠনগুলো, যেই ক্যাম্পাসকে নানা দুঃসময়ে কম্পাসের ন্যায় পথ দেখিয়েছেন বস। অজানা আশঙ্কায় সে রাতেও আমরা খালাম্মার সামনে দাঁড়াতে সাহস পাইনি। ছোট বোন রিতু বললো মা এখন অতি শোকে পাথরের ন্যায় নিরবাক নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে, আপনাদের দেখে মা যে কী করবে কে জানে? ১৪ তারিখ অগ্রজ সহোদর রাজু ভাই এলেন সুদূর কানাডা থেকে। জানি না কতটা কষ্ট বুকে চেপে পৃথিবীর অন্যপ্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন তিনি। রাজু ভাইর কারণে আমরাও সাহসী হয়ে খালাম্মার সামনে এসে দাঁড়ালাম। অবিশ্বাস্যভাবে তিনি উল্টো সান্ত্বনা দিচ্ছেন সন্তানদের-
তোরা কান্দিস ক্যান, তোরা ভেঙে পড়লে ওদের কী হবে যাদের জন্য রিমু প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করতো। চিন্তা করিস না আমি ওদেরকে ফোনে বলে দিয়েছি রিমু নাই তো কী হয়েছে, আমি তো আছি। আমার রিমুর যেন কোনো স্বপ্ন অপূর্ণ না থাকে! যখন যা লাগে আমাকে বলবে আমি সব ব্যবস্থা করে দিব। আদাবরের জমিটাও আমি ওদের লিখে দিব…

রক্ত-মাংসে গড়া কোনো বাঙালি মা নয়, কোনো দেবতার পক্ষেও এই সময় এমন উচ্চারণ সম্ভব বলে আমার বিশ্বাস হয় না। রাজু ভাই বললেন আমাদের সাভারের জমিটায় রিমুর স্বপ্নের ইশারা ভাষা ইনস্টিটিউট করতে চাই। তোমরা পাশে থেকো। ৮১ শুক্রাবাদ আসলে মর্ত্যরে কোনো বাড়ি নয়, শুধুই একটি অমৃতালয় দেবগৃহ যেখানে বাস করে অমৃতের সন্তানেরা।

১২ মার্চ, সবকিছু ভেঙে পড়ার আগে আমার একটা দুঃসহ স্মৃতি আছে বসকে নিয়ে। অনেক রাত আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে সেই স্মৃতি- বসের প্রথম সন্তান জন্মের পরপরই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে। বুকভরা কান্না চেপে সদ্যজাত মৃত সন্তানের শবদেহ কোলে নিয়ে বস দ্রুতবেগে এগিয়ে আসছেন ল্যাব এইডের বারান্দা দিয়ে। গল্প-উপন্যাসে পড়েছি পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জিনিস কোনটা, কিন্তু বাস্তবে বসকে দেখেছি সেই ভার বহন করতে। তার ঠিক এক দশক পর দূর হিমালয়ের দেশে যেদিন ইউএস বাংলার বিমানটি ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে বিধ্বস্ত হলো জানতে ইচ্ছে করে সে সময়ে ছোট্ট অনিরুদ্ধ কী করছিল?

হয়তো ‘মা আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না…মরে যাচ্ছি মা…আগুন, আগুন মা…পানি দেও মা, আমি পানি খাব’ বলে বিপাশকে জড়িয়ে ধরেছিল! না কি সিট বেল্ট খুলতে না পারায় সিটেই অঙ্গার হয়েছে ছোট্ট দেহটি! আচ্ছা বস আপনি তখন কী করছিলেন? মৃত সন্তানের দেহ যদি পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তু হয় তবে স্ত্রী-সন্তানসহ ওজনটা কত হবে বস? আপনারতো পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে বস, আপনি এত পারেন কিন্তু আমাদের বিপাশ-অনিকে আপনি বাঁচাতে পারলেন না? নাকি অমৃতের সন্তানরা এভাবেই বিদায় নেয় বস! ত্রিভুবন থেকে কোন ভুবনে হারিয়ে গেল সব