”আব্দুর রাজ্জাক” আমার শৈশবের বঙ্গবন্ধু

0
1257

বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসেছি কবেথেকে মনে নেই। বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রথম প্রেমের মতই অন্ধ ছিলাম শৈশবে। প্রাইমারীর বারান্দা পার হওয়ার পর অবুঝ সেই প্রেমের তীব্রতা বাড়তে থাকে। পাড়ার মঞ্জু ভাই, বদরুল ভাই, রেজাউল ভাই ছিল আমার শৈশবের প্রিয় মানুষ । বড় হওয়ার সাথে সাথে বিকেলে খেলার মাঠের চেয়ে বড়দের আড্ডায় আসক্তি বাড়তে থাকে। বাসার সামনের পাবলিক লাইব্রারী ছিল আড্ডার কেন্দ্র। বড়ভাইরা আমাকে শোনাত মুক্তিযুদ্ধের কথা, বঙ্গবন্ধুর কথা, রাজাকারদের কুকৃত্তির কথা। পাড়ার বড়রা প্রায় সকলেই জাতীয় ছাত্রলীগ করত। আমাকে বলতো তুমি শুধু বঙ্গবন্ধুকে নয় যদি তার আদর্শকে ভালোবাস তবে আওয়ামীলীগ নয় বাকশালকেই পছন্দ করা উচিত। ছাত্রলীগ নয় জাতীয় ছাত্রলীগই তার আদর্শের সংগঠন। প্রতিদিনই আমার কাউন্সিলিং চলছে।

মঞ্জুভাই একদিন বলল কয়েকদিন পরেই জাতীয় ছাত্রলীগের জেলা কাউন্সিল, নেতা আসবেন। তুমি শুধু একবার তার বক্তৃতা শোন তোমার কাছে আর কিছুই আর চাইবনা। ততদিনে আমার বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষন দাড়ি কমা সহ মুখসত্ম হয়ে গেছে। রাজি হয়ে গেলাম। নেতা আসলেন। পুরনো টাউন হলে বক্তৃতা করলেন। মনে হল বঙ্গবন্ধুর কন্ঠ শুনছি। হুবাহু ৭ই মার্চের কন্ঠ। যেন সাড়্গাত বঙ্গবন্ধু। কী বলেছেন বক্তৃতায় কিছুই মনে নাই; এতটুকু বলতে পারি আমি পুরোপুরি সম্মোহিত। স্কুলের বারান্দা পেরিয়ে প্রিয় পটুয়াখালী ছেড়ে ভর্তি হলাম স্বপ্নের ঢাকা কলেজে। ভীষন ব্যসত্ম আমি তখন। পড়াশুনোয় ঠনঠন, ব্যসত্ম সারাদিন রাজনীতি, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা ও আড্ডায় । ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদ ১৯৯০-৯১ এ ছাত্রলীগ থেকে একমাত্র আমি বার্ষিকী সম্পাদক নির্বাচিত হই। অমর কথা সাহিত্যিক আখতারম্নজ্জআমান ইলিয়াস স্যার আমার উপদেষ্টা শিড়্গক ।

১৮৪১ সালে স’পিত ঢাকা কলেজ বাংলাদেশের শিড়্গিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী গঠনে সবচেয়ে বড় ভ’মিকা রেখেছে। বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি সবকিছুরই সূতিকাঘর ঢাকা কলেজ। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও জন্ম ঢাকা কলেজ থেকে বললে অত্যুক্তি হবে না। স্যারকে বললাম স্যার ঢাকা কলেজের ইতিহাস সংরড়্গণ করতে চাই। স্যার আমাকে গাইড লাইন দিলেন- কিভাবে এগুতে হবে। গুরম্নত্ব দিলাম কথ্য ইতিহাস সংগ্রহে। শুরম্ন হল আমার নতুন সংগ্রাম। সাবেক ছাত্রদের স্মৃতি কথা সংগ্রহ। আমার ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সেই সুযোগে কালজয়ী কিছু মহান ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য পাওয়া।

জানলাম আব্দুর রাজ্জাক- আমার শৈশবের বঙ্গবন্ধু ঢাকা কলেজের ১৯৬০ সালের ছাত্র। জানলাম মুক্তিযুদ্ধের এই মহান সংগঠকের ঢাকায় নিজের কোন বাড়ী নেই। থাকেন ঝিগাতলার শ্বশুরালয়ে। পার্টি অফিস থেকে ঠিকানা সংগ্রহ করে একাই একদিন সকালে তার বাসায় গেলাম। স্বপ্নের মানুষরা বাসত্মবে কেমন হয় জানিনা। আমার শৈশবের সেই মহান নেতাকে সামনা সামনি দেখব কিছুড়্গণের মধ্যে। উত্তেজনায় লাল চা ও টোস্ট বিস্কুট গলা থেকে নামছে না। এরমধ্যেই ভড়াট গলার আওয়াজ – কে কে আসছিস শুনতে শুনতেই দেখলাম নেতা আসছেন। এমন ভড়াট গলায় দরাজ কন্ঠ আগে কোন দিন শুনিনি। সবাই দাড়ালাম; ইশারা পেয়ে আবার বসলাম। দেখলাম সবাইকেই তিনি তুই করে বলছেন। প্রায় সকলেই তার নির্বাচনী এলাকার।

আমার দিকে তাকিয়ে বললেন তুই কে রে? সংড়্গেপে বললাম কি বিষয়। অপেড়্গা করতে বললেন। এলাকার লোকদের বিদায় দিয়ে কাছে ডাকলেন আমাকে। নেতা বলতে লাগলেন তার কলেজ জীবন। প্রায় ঘন্টা খানেক সময় দিলেন। রেকর্ডার অন করে আবার নোট ও নিলাম; কিন’ বলতে পারলাম না আমার শৈশবের প্রথম প্রেমের কথা। তারপর অনেক দিন কেটে গেল। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে শুরম্ন হল আরেক সংগ্রাম – গণ আদালত। প্রতিটি মিছিল মিটিংয়ে যাচ্ছি। আওয়ামী লীগের কোন নেতা থাকুক বা না থাকুক আমার নেতা থাকতেন প্রতিটি প্রোগ্রামে। ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার ব্যসত্মতা বেড়ে গেল বহুগুণ। রাজনীতি ও সংস্কৃতি ছাড়াও ক্যাম্পাসের বঞ্চিত শিশুদের জন্য টিএসসিতে অর্ক নামে একটা স্কুল শুরম্ন করেছি। তাই নিয়ে মেতে থাকি সারাদিন। প্রায় ৫/৬ বছর পর সিটি কলেজের সামনে দিয়ে রিক্সায় যাচ্ছি। হঠাৎ ভড়াট গলার সেই দরাজ কন্ঠ, পুরোনো একটি খোলা জিপ থেকে -সুমন জাহিদ, কীরে কেমন আছিস? আর তো আসলি না? উত্তর আর দিতে পারলাম না। কেননা আমি তখন আড়্গরিক অর্থেই কিংকর্ত্যব্যবিমূঢ়। বঙ্গবন্ধুর স্মরণশক্তি নিয়ে প্রচুর লেখা হয়েছে। আমার কাছে সেটা গাল-গপ্পো মনে হত। কিন’ বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া সবচেয়ে দড়্গ সংগঠক আব্দুর রাজ্জ্‌াকের স্মরণশক্তি দেখে বুঝলাম না কোন কিছুই গাল-গপ্পো নয়; আমার মনে হল তিনিই তার যোগ্য উত্তরাধিকার।

আজ ২৩ ডিসেম্বর শুক্রবার ছুটির দিনে সকালে টিভিতে দেখলাম জননেতা আব্দুর রাজ্জ্‌াক লন্ডনে জীবন মৃত্যুর সন্ধিড়্গণে। ফেইসবুকে সবার শুভ কামনার জন্য উপরোক্ত স্ট্যাটাস টি লিখে পোষ্ট না দিয়ে বিকেলে পটুয়াখালী সমিতির পুনর্মীলনীতে যোগ দিলাম। ইচ্ছে ছিল রাতে স্ট্যাটাস টি পোষ্ট দিব। বাসায় ফেরার সময় শুনলাম নেতা নেই। নেতার জন্য আর কারো শুভ কামনা প্রার্থনা করতে পারলাম না। বড় অভিমান নিয়ে চলে গেল সে।