আইন ও আবেগের যাঁতাকলে পিষ্ট আমার জাতীয় পতাকা

0
1787

ডিসেম্বর ১৪, শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস। ২০০৭ সাল থেকে এইদিনে শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ, স্লোগান-৭১সহ টিএসসিকেন্দ্রিক সকল সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন সমূহের যৌথ উদ্যোগে তিন দিনের বিজয় উৎসব। কোন প্রকারের প্রাতিষ্ঠানিক স্পন্সর কিংবা অর্থায়ন ছাড়া টিএসসির বর্তমান ও সাবেক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক কর্মীদের আর্থিক ও আত্মিক অংশগ্রহণ এই উৎসবের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও অনন্যদিক। উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ টিএসসির সমান উচ্চতার একটি বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা সেলাই ও উড্ডয়ন। জাতীয় পতাকার প্রথম নক্শাকার শিব নারায়ণ দাসের নেতৃত্বে স্লোগান৭১-এর উদ্যোগে বিশাল কর্মী বাহিনী এবার এটি নির্মাণ করেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ এই উৎসবে অংশগ্রহন করে, যাদের সকলের হৃদয়ে থাকে মুক্তিযুদ্ধ, বুকে বাংলাদেশ। এখানে বন্ধুরা আসে যুথবদ্ধ হয়ে, প্রেয়সী আসে তরুন প্রেমিকের বিশ্বস্ত হাত ধরে, মাঝ বয়সী দম্পতি আসে সপরিবারে, শ্রমিক আসে, ছাত্র আসে, আসে চাকুরিজীবি কিংবা ব্যবসায়ী এমনকি পিতার কাঁধে চড়ে সন্তানও আসে টিএসসিতে।

কারো মাথায় বাঁধা থাকে জাতীয় পতাকা, কারো বাহুতে কিংবা গলায় জড়ানো পতাকা, কারো গায়ে লাল সবুজের শাড়ি-কোর্তা কিংবা ফতুয়া। কেউ আসে পায়ে হেঁটে, কেউবা গাড়ী, মটর সাইকেল, সিএনজি কিংবা রিক্সায়। প্রায় সকল বাহনেই উড়ে জাতীয় পতাকা। যে রিক্সাওয়ালার পতাকা কেনার সামর্থ নেই তার প্যাসেঞ্জার ভ্রাম্যমান পতাকাওয়ালা থেকে কখনো পতাকা কিনে পরম মমতায় গেঁথে দেয় হ্যান্ডেলের মাঝে। বিজয়ের মাসে লম্বা বাঁশে পতাকা বেঁধে রাজপথ জুড়ে ঘুরে বেড়ায় পতাকাওয়ালা, রাজধানী কিংবা মফস্বলের দর্জিরা ব্যস্ত পতাকা সেলাইয়ে, জিন্দাবাহার লেনের প্রেসগুলো আরো জিন্দা হয় -তারা ব্যস্ত নিউজপ্রিন্টের পতাকা ছাপাতে- যে পতাকা শোভা পায় অজোপাড়া গাঁয়ের দুরন্ত শিশুর হাতে ধরা বাঁশের কঞ্চিতে। এই আবেগ মুক্তিযুদ্ধের, এই আবেগ দেশপ্রেমের, এই আবেগ বিজয়ের। বিজয়ের ৪১ বছরধরে রক্তে রাঙা পতাকা হাতে এভাবেই শ্রদ্ধাবনত চিত্তে সম্মান জানায় আমজনতা ৩০ লক্ষ শহীদের জন্য, স্বাধীন এই দেশটির জন্য।

বাঁধভাঙ্গা এই আবেগ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২ অনুযায়ী অবৈধ । ২০১০ সালের সংশোধনী অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদন্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দন্ড। এই অপরাধে অপরাধী জাতীয় পতাকার আদি নক্শাকার শিব নারায়ণ দাস স্বয়ং, অপরাধী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মী যাদের নিয়ে শিব নারায়ণ তৈরী করেছেন ৪৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৬ ফুট প্রস্থের পতাকা যেটি এখনও উড়ছে টিএসসির মাঝবরাবর। অপরাধী কোটি কোটি বাঙালী যারা পতাকা হাতে দেশজুড়ে অংশ নিয়েছে তার প্রানের উৎসবে।

জাতীয় পতাকা একটি রাষ্ট্রের পরিচয়, জাতীয়তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ও অস্তিত্বের প্রতীক। তাই একটি পতাকার জন্য নয় মাসের ন্যায়যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল সাতকোটি বাঙালী। ন্যায়যুদ্ধে বিজয়ী জাতি সেই রক্তে রাঙা পতাকা হাতে নিয়ে বিনম্র শ্রদ্ধায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতি, ৩০ লক্ষ শহীদদের প্রতি, মাতৃভূমির প্রতি সম্মান জানিয়ে ৪১ বছরধরে অন্যায় কাজ করে এটা মেনে নেয়া কষ্টকর। পতাকা বিধিমালা-১৯৭২ যিনি একবার পড়বেন তার হৃদয়ে অবিরত রক্তক্ষরণ অনিবার্য। অনেক রক্তের দামে কেনা আমার লাল সবুজ পতাকার সাংবিধানিক অহর্নীশ অবমাননা কেউই মানতে রাজী নই আমরা। ‘পতাকার মান সমুন্নত রাখা আমাদের গুরু দায়িত্ব সত্য; কিন্তু আইনী কঠোরতাই এই অনিবার্য অবমাননার মূল কারণ’ এটি বললে বোধহয় খুববেশী অত্যুক্তি হবে না।